০৭:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বিজ্ঞপ্তি

কেমন আছে ফিলিস্তিন ও মুসলমানদের প্রথম কেবলা ?

মো. ছাব্বির হোসাইন

‘আল-কুদস’ বলতে বোঝায় ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে পবিত্র ভূমিতে অবস্থিত পবিত্র মসজিদ। যা মসজিদুল আকসা বা ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ নামে পরিচিত। ইসলামের পবিত্রতম অন্যতম স্থান বাইতুল মুকাদ্দাস বা মসজিদ আল-আকসাসহ অসংখ্য নবি-রাসুলদের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক জেরুজালেম শহর বর্তমানে অভিশপ্ত ইহুদিরা অবৈধভাবে দখল করে আছে। যার চত্ত্বরে আজো অসংখ্য নবি-রাসুলের মাজার বিদ্যমান। মসজিদুল আকসা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অনেকরই অজানা। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কর্তৃক পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণের ৪০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর নাতি বনি ইসরাইলের প্রথম নবি হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ শহর জেরুজালেমে মসজিদ আল-আকসা নির্মাণ করেন। অতঃপর হজরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম জিন জাতির মাধ্যমে এ পবিত্র মসজিদ পুনঃনির্মাণ করেন। প্রথমে ‘কাবা’ কেবলা থাকলেও মসজিদুল আকসা বা ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ স্থাপনের পর এটি কেবলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এটি মুসলমানদের প্রথম কেবলা।

 

ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ষড়যন্ত্র:

১৫ জুলাই ১০৯৯ সাল, ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক বেদনাদায়ক দিন। সেদিন অযোগ্য মুসলিম শাসকদের ছত্রছায়ায় খ্রিস্টান ক্রুসেডার বাহিনী সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখল করে। এরপরই ঘটতে থাকে হৃদয় বিদারক অসংখ্য ঘটনা। যা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য বড়ই বেদনাদায়ক। খ্রিস্টানরা ১০৯৯ সালের ৭ জুন প্রথমে জেরুজালেমে অবস্থিত ‘বায়তুল মুকাদ্দাস তথা মসজিদ আল-আকসা’ অবরোধ করে এবং ১৫ জুলাই মসজিদের ভেতর প্রবেশ করে ব্যাপক পরিবর্তন করে। অতঃপর এ পবিত্র মসজিদে তারা তাদের উপাসনালয় (গির্জায়) পরিণত করে।

 

বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার:

২৩ মার্চ ১১৬৯ খ্রিস্টাব্দ, ফাতেমীয় খেলাফতের রাজত্বকালে খলিফার নির্দেশে সেনাপতি হজরত সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি গভর্নর ও সেনাপ্রধান হয়ে মিসরে আগমন করেন। ২০ সেপ্টেম্বর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে রক্তক্ষয়ী সমরাভিযানের মাধ্যমে তিনি মসজিদ আল-আকসাসহ পুরো ঐতিহাসিক জেরুজালেম নগরী মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। ২ অক্টোবর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি ও গভর্নর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীবেশে বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেন। সালাহউদ্দিন আইয়ুবি কর্তৃক বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত হওয়ার পর জেরুজালেমে দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দিব্যাপী মুসলমানরা খ্রিস্টানদের অত্যাচার থেকে মুক্ত ছিল।

 

ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনের বর্তমান অবস্থা:

আজ ভালো নেই অসংখ্য নবি-রাসুলদের স্মৃতি বিজড়িত মুসলমানদের প্রথম কেবলা। দীর্ঘকাল ধরে মুসলমানরা খ্রিস্টানদের সঙ্গে লড়াই করে এ মসজিদের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন। সবশেষে শুরু হয়েছে ইহুদি আগ্রাসন। খ্রিষ্টান ও ইহুদি চক্র ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এ অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ইহুদিরা তৎকালীন তুরস্কের শাসক সুলতান আবদুল হামিদের কাছে ফিলিস্তিনে বসতির অনুমতি চায়; সুলতান অনুমতি দেননি। ১৯১৭ সালে ইংরেজরা ফিলিস্তিনে অনুপ্রবেশ করে এবং ১৯২০ সালে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে; এর অল্প সময়ের মধ্যে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা অন্যায়ভাবে মুসলমানদের ফিলিস্তিন ভূমিকে মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। ফলে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে জায়নবাদী অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল ‘মসজিদুল আকসা’ জবরদখল করে। তারপর ক্রমশ মুসলমানদের প্রতি ইহুদিদের জুলুম-নির্যাতন ও অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে, যা আজও চলছে। আজ মসজিদ আল-আকসা মুসলমানদের হাতছাড়া এবং ইহুদিদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও অবরুদ্ধ। প্রতিদিনই প্রায় বহু মানুষ প্রাণ দিচ্ছে এই পবিত্র ভূমি ও পবিত্র মসজিদের জন্য। ফিলিস্তিনি মুসলমানদের উপর ইসরাইলি ইহুদিদের অত্যাচার, নির্যাতন যেন থামছেই না। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী বাহিনী ‘হামাস’ ইসরাইলি ইহুদিদের উপর হামলা চালিয়ে ওদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ইনশা-আল্লাহ ইসরাইলি ইহুদিদের বিপক্ষে মুসলিমদের বিজয় হবেই!

 

কেবলা পরিবর্তনের ঘটনা:

ইসলামের প্রাথমিক জামানায় আল্লাহর আদেশে মসজিদে আকসার দিকে ফিরে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু মুহাম্মাদের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল কাবার দিকে ফিরে নামায পড়া। তাই তিনি মক্কায় থাকাকালীন এমন সমান্তরালভাবে নামাজে দাড়াতেন যেন কাবা এবং মসজিদে আকসা সম্মুখে থাকে। কিন্তু মুসলমানরা যখন মদীনায় হিযরত করেন, তখন নামাজ পড়ার সময় কাবাকে আল-আকসার মাঝে রাখার সুযোগ আর ছিলো না। কেননা, মদীনার অবস্থান ছিল মক্কা থেকে উত্তরে। মদীনারও উত্তরে অবস্থান জেরুসালেমের। ফলে নামাজ আদায়ের সময় মক্কার দিকে ঘুরে দাঁড়ানোর কোন সুযোগ প্রইয় নবী (সা.)-এর জন্য ছিলো না। এছাড়াও কাবা পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম ঘর যা মানুষের দ্বারা বানানো হয়েছে। মুহাম্মদ (সা.) এই কারণে খুবই মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন। তার সর্বদাই মনে হতো, তিনি ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক নির্মিত আল্লাহর প্রথম এই ঘরকে সম্মান জানাতে পারছেন না। তার এই অনুভূতির জন্য তিনি অবশ্য কেবলা পরিবর্তনের জন্য আল্লাহর কাছে কোনো প্রার্থনা করেননি। তবে যখন মক্কার দিকে মুখ ফিরিয়ে নামাজ না পড়তে পারার কষ্ট কাজ করতো, তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ফলে মদীনায় হিযরতের পরের বছরই আল্লাহ কেবলা পরিবর্তনের আদেশ দিয়ে প্রিয় নবী (সা.)-এর উপর আয়াত নাযিল করেন।

 

আকাঙ্ক্ষিত বরকতময় মূহূর্তটি ছিল হিজরি দ্বিতীয় সনের শাবান মাস। মদীনা থেকে একটু দূরে মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সাথীদেরকে নিয়ে এক মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন । তখনো মসজিদুল আকসা মুসলিমদের কেবলা। আল্লাহ তায়ালা কুরআনের আয়াত নাযিল করে কেবলা পরিবর্তন করতে বললেন। হে নবী! আমি আপনার চেহারাকে বারবার আকাশের দিকে উঠতে দেখছি। সুতরাং যে কেবলাকে আপনি পছন্দ করেন আমি শীঘ্রই সে দিকে আপনাকে ফিরিয়ে দেব। সুতরাং এবার মসজিদুল হারামের দিকে নিজের চেহারা ফেরান এবং (ভবিষ্যতে) তোমরা যেখানেই থাক (সালাত আদায়কালে) নিজের চেহারা সে দিকেই ফেরাবে। যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাঁরা জানে এটাই সত্য, যা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এসেছে। আর তারা যা কিছু করছে আল্লাহ সে সম্বন্ধে উদাসীন নন। (সূরা বাকারা-১৪৪) দুই রাকাত নামাজ আদায়ের পরই এই আয়াত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নাযিল হয়। বাকী দুই রাকাত নামাজ তিনি মক্কার কাবার দিকে ফিরে আদায় করেন। আর যে মসজিদে এ ঘটনা ঘটে সে মসজিদকে ‘মসজিদে কিবলাতাইন’ বা ‘দুই কেবলার মসজিদ’ বলা হয়।

লেখক: কবি, কলামিস্ট, সাংবাদিক

প্রচার সম্পাদক, মেঘদূত লেখক পর্ষদ।

ট্যাগস :
আপডেট : ০৬:৫০:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ নভেম্বর ২০২৩
৮১ বার পড়া হয়েছে

কেমন আছে ফিলিস্তিন ও মুসলমানদের প্রথম কেবলা ?

আপডেট : ০৬:৫০:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ নভেম্বর ২০২৩

‘আল-কুদস’ বলতে বোঝায় ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে পবিত্র ভূমিতে অবস্থিত পবিত্র মসজিদ। যা মসজিদুল আকসা বা ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ নামে পরিচিত। ইসলামের পবিত্রতম অন্যতম স্থান বাইতুল মুকাদ্দাস বা মসজিদ আল-আকসাসহ অসংখ্য নবি-রাসুলদের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক জেরুজালেম শহর বর্তমানে অভিশপ্ত ইহুদিরা অবৈধভাবে দখল করে আছে। যার চত্ত্বরে আজো অসংখ্য নবি-রাসুলের মাজার বিদ্যমান। মসজিদুল আকসা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অনেকরই অজানা। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম কর্তৃক পবিত্র কাবা ঘর নির্মাণের ৪০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর নাতি বনি ইসরাইলের প্রথম নবি হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালাম ঐতিহাসিক প্রসিদ্ধ শহর জেরুজালেমে মসজিদ আল-আকসা নির্মাণ করেন। অতঃপর হজরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম জিন জাতির মাধ্যমে এ পবিত্র মসজিদ পুনঃনির্মাণ করেন। প্রথমে ‘কাবা’ কেবলা থাকলেও মসজিদুল আকসা বা ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ স্থাপনের পর এটি কেবলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এটি মুসলমানদের প্রথম কেবলা।

 

ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ষড়যন্ত্র:

১৫ জুলাই ১০৯৯ সাল, ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক বেদনাদায়ক দিন। সেদিন অযোগ্য মুসলিম শাসকদের ছত্রছায়ায় খ্রিস্টান ক্রুসেডার বাহিনী সমগ্র সিরিয়া ও ফিলিস্তিন দখল করে। এরপরই ঘটতে থাকে হৃদয় বিদারক অসংখ্য ঘটনা। যা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য বড়ই বেদনাদায়ক। খ্রিস্টানরা ১০৯৯ সালের ৭ জুন প্রথমে জেরুজালেমে অবস্থিত ‘বায়তুল মুকাদ্দাস তথা মসজিদ আল-আকসা’ অবরোধ করে এবং ১৫ জুলাই মসজিদের ভেতর প্রবেশ করে ব্যাপক পরিবর্তন করে। অতঃপর এ পবিত্র মসজিদে তারা তাদের উপাসনালয় (গির্জায়) পরিণত করে।

 

বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার:

২৩ মার্চ ১১৬৯ খ্রিস্টাব্দ, ফাতেমীয় খেলাফতের রাজত্বকালে খলিফার নির্দেশে সেনাপতি হজরত সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি গভর্নর ও সেনাপ্রধান হয়ে মিসরে আগমন করেন। ২০ সেপ্টেম্বর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে রক্তক্ষয়ী সমরাভিযানের মাধ্যমে তিনি মসজিদ আল-আকসাসহ পুরো ঐতিহাসিক জেরুজালেম নগরী মুসলমানদের অধিকারে নিয়ে আসেন। ২ অক্টোবর ১১৮৭ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি ও গভর্নর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীবেশে বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেন। সালাহউদ্দিন আইয়ুবি কর্তৃক বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত হওয়ার পর জেরুজালেমে দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দিব্যাপী মুসলমানরা খ্রিস্টানদের অত্যাচার থেকে মুক্ত ছিল।

 

ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনের বর্তমান অবস্থা:

আজ ভালো নেই অসংখ্য নবি-রাসুলদের স্মৃতি বিজড়িত মুসলমানদের প্রথম কেবলা। দীর্ঘকাল ধরে মুসলমানরা খ্রিস্টানদের সঙ্গে লড়াই করে এ মসজিদের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন। সবশেষে শুরু হয়েছে ইহুদি আগ্রাসন। খ্রিষ্টান ও ইহুদি চক্র ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। এ অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ইহুদিরা তৎকালীন তুরস্কের শাসক সুলতান আবদুল হামিদের কাছে ফিলিস্তিনে বসতির অনুমতি চায়; সুলতান অনুমতি দেননি। ১৯১৭ সালে ইংরেজরা ফিলিস্তিনে অনুপ্রবেশ করে এবং ১৯২০ সালে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে; এর অল্প সময়ের মধ্যে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা অন্যায়ভাবে মুসলমানদের ফিলিস্তিন ভূমিকে মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে ভাগ করে দেয়। ফলে ১৯৪৮ সালের ১৫ মে বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে জায়নবাদী অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সালে অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইল ‘মসজিদুল আকসা’ জবরদখল করে। তারপর ক্রমশ মুসলমানদের প্রতি ইহুদিদের জুলুম-নির্যাতন ও অত্যাচারের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে, যা আজও চলছে। আজ মসজিদ আল-আকসা মুসলমানদের হাতছাড়া এবং ইহুদিদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও অবরুদ্ধ। প্রতিদিনই প্রায় বহু মানুষ প্রাণ দিচ্ছে এই পবিত্র ভূমি ও পবিত্র মসজিদের জন্য। ফিলিস্তিনি মুসলমানদের উপর ইসরাইলি ইহুদিদের অত্যাচার, নির্যাতন যেন থামছেই না। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী বাহিনী ‘হামাস’ ইসরাইলি ইহুদিদের উপর হামলা চালিয়ে ওদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ইনশা-আল্লাহ ইসরাইলি ইহুদিদের বিপক্ষে মুসলিমদের বিজয় হবেই!

 

কেবলা পরিবর্তনের ঘটনা:

ইসলামের প্রাথমিক জামানায় আল্লাহর আদেশে মসজিদে আকসার দিকে ফিরে নামাজ আদায় করতেন। কিন্তু মুহাম্মাদের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল কাবার দিকে ফিরে নামায পড়া। তাই তিনি মক্কায় থাকাকালীন এমন সমান্তরালভাবে নামাজে দাড়াতেন যেন কাবা এবং মসজিদে আকসা সম্মুখে থাকে। কিন্তু মুসলমানরা যখন মদীনায় হিযরত করেন, তখন নামাজ পড়ার সময় কাবাকে আল-আকসার মাঝে রাখার সুযোগ আর ছিলো না। কেননা, মদীনার অবস্থান ছিল মক্কা থেকে উত্তরে। মদীনারও উত্তরে অবস্থান জেরুসালেমের। ফলে নামাজ আদায়ের সময় মক্কার দিকে ঘুরে দাঁড়ানোর কোন সুযোগ প্রইয় নবী (সা.)-এর জন্য ছিলো না। এছাড়াও কাবা পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম ঘর যা মানুষের দ্বারা বানানো হয়েছে। মুহাম্মদ (সা.) এই কারণে খুবই মনঃক্ষুণ্ন ছিলেন। তার সর্বদাই মনে হতো, তিনি ইবরাহীম (আ.) কর্তৃক নির্মিত আল্লাহর প্রথম এই ঘরকে সম্মান জানাতে পারছেন না। তার এই অনুভূতির জন্য তিনি অবশ্য কেবলা পরিবর্তনের জন্য আল্লাহর কাছে কোনো প্রার্থনা করেননি। তবে যখন মক্কার দিকে মুখ ফিরিয়ে নামাজ না পড়তে পারার কষ্ট কাজ করতো, তখন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ফলে মদীনায় হিযরতের পরের বছরই আল্লাহ কেবলা পরিবর্তনের আদেশ দিয়ে প্রিয় নবী (সা.)-এর উপর আয়াত নাযিল করেন।

 

আকাঙ্ক্ষিত বরকতময় মূহূর্তটি ছিল হিজরি দ্বিতীয় সনের শাবান মাস। মদীনা থেকে একটু দূরে মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সাথীদেরকে নিয়ে এক মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করছিলেন । তখনো মসজিদুল আকসা মুসলিমদের কেবলা। আল্লাহ তায়ালা কুরআনের আয়াত নাযিল করে কেবলা পরিবর্তন করতে বললেন। হে নবী! আমি আপনার চেহারাকে বারবার আকাশের দিকে উঠতে দেখছি। সুতরাং যে কেবলাকে আপনি পছন্দ করেন আমি শীঘ্রই সে দিকে আপনাকে ফিরিয়ে দেব। সুতরাং এবার মসজিদুল হারামের দিকে নিজের চেহারা ফেরান এবং (ভবিষ্যতে) তোমরা যেখানেই থাক (সালাত আদায়কালে) নিজের চেহারা সে দিকেই ফেরাবে। যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, তাঁরা জানে এটাই সত্য, যা তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে এসেছে। আর তারা যা কিছু করছে আল্লাহ সে সম্বন্ধে উদাসীন নন। (সূরা বাকারা-১৪৪) দুই রাকাত নামাজ আদায়ের পরই এই আয়াত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নাযিল হয়। বাকী দুই রাকাত নামাজ তিনি মক্কার কাবার দিকে ফিরে আদায় করেন। আর যে মসজিদে এ ঘটনা ঘটে সে মসজিদকে ‘মসজিদে কিবলাতাইন’ বা ‘দুই কেবলার মসজিদ’ বলা হয়।

লেখক: কবি, কলামিস্ট, সাংবাদিক

প্রচার সম্পাদক, মেঘদূত লেখক পর্ষদ।