১১:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিজ্ঞপ্তি

ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ এগিয়ে চলছে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে

মো. বেল্লাল হাওলাদার 
ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে বাঙালির কাতরচিত্তে করুণ আহাজারির কথা, একুশের রক্তঝরা দিনের কথা- লাখো মানুষের প্রাণের আশা অর্জিত মাতৃভাষা বাংলার কথা। মনে পড়ে বায়ান্ন’র সেই করুণ কাহিনী আর রক্তাক্ত রাজপথের কথা, সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ আর’ও কত জনের আর্তচিৎকারের কথা যাদের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি প্রাণে’র ভাষা।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি’কে দাবিয়ে রাখার মূলমন্ত্র সেই রক্তক্ষয়ী মহাকৌশলের নিপীড়ন, নির্মম অত্যাচার, অনাচার, আর বঞ্চনার ইতিহাসের কথা। এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির লগ্ন থেকেই শুরু মানুষের মধ্যে মানুষের ভেদাভেদ, ক্ষমতার লোভ, হিংসা বিদ্বেষ। এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের শাসন করবার চেষ্টায় ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে করেছে যুদ্ধ। ঘটেছে জীবন নেওয়া দেওয়ার মতো অগুনতি ঘটনা। তবে নিজস্ব ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার ইতিহাস একমাত্র আমাদের বাঙালির। একারনে’ই বাঙালি তথা বাংলাভাষীদের জন্য এ দিনটি একদিকে যেমন শোকের, অন্যদিকে তেমনি গৌরবেরও বটে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, একুশ আমাদের শতসহস্র চেতনা ও প্রেরণার উৎস; কিন্তু সমসাময়িক সমাজের দিকে তাকালে যে কারোরই মনে এই প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, অর্ধশতকের’ও বেশি সময় আগে আমাদের পূর্ববর্তী মৃত্যুঞ্জয়ী প্রজন্ম একুশের যে চেতনা আমাদের দিয়ে গিয়েছিল, তা আমরা জনমনে কত’টা সচেতন ভাবে তুলে ধরতে পেরেছি? যেসব তরুণ একসময় মা, মাটি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল, তাদের উত্তরসূরি বর্তমান প্রজন্ম আজ অনেকেই জানে’ই না একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কি দিবস! কেন একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এইতো সেদিন একুশের বইমেলায় গিয়ে আমার চোখে পড়ে এক ইউটিউবার এ প্রজন্মের কলেজ পড়ুয়া তরুণ তরুণীর কাছে জানতে চেয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি কোন দিবস?
সঠিক উত্তর অনেকে’ই দিতে পারেনি! সে ভিডিওর দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে সারা বিশ্ব দেখেছে। এ দায় কার.? বাঙালি জাতি হিসেবে এটা অত্যন্ত দুঃখের ও লজ্জার। ভাবতে কষ্ট হয়, এটি কি সেই বাংলাদেশ, যার জন্ম হয়েছে এক’টা জাতির  মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এদেশে একজন নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করে স্বাধীনভাবে বাংলার সংস্কৃতিকে নামেমাত্র বুকে ধারণ করে খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত বিহঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি, অথচ সেই দেশের জন্মের ইতিহাসকে আমরা ভুলতে বসেছি! এই তরুণ প্রজন্ম জানছে না বা সচেতন শিক্ষা ব্যবস্থা সঠিকভাবে জানাচ্ছে না‌। জানালেও জ্ঞানের পরিধি কম থাকায় মেমোরিতে ধরে রাখতে পারছে না। তার মূল কারণ এই প্রজন্মের অনেকেই অনলাইন সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার ও বিদেশি অপকালচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অনলাইন মেসেঞ্জার হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খুলে ফানি ভিডিও টিকটকে সেলিব্রেটি হওয়ার নেশায় মগ্ন। যার কারণে নিজের দেশের ইতিহাস জানার সময় কই.? তারা আজকে নিজের সংস্কৃতির চেয়ে বিদেশি অপসংস্কৃতি ও আকাশ সংস্কৃতিকে অতিমাত্রায় গ্রহণ করছে। ফলস্বরূপ নিজ দেশের লড়াই সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা ও স্বাধীনতার ইতিহাস না জানতে পারলে সমাজে সামাজিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা ক্রমেই বেড়ে যাবে। আমি দেখছি, ধীরে ধীরে সমাজের নতুন প্রজন্ম এগিয়ে চলছে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে। এগুলো কি আমাদের বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ কিংবা বায়ান্নোর ভাষা সৈনিকদের নজরে আসে না? নজরে আসে কি তাদের মা-বাবা ইস্কুল কলেজের শিক্ষকদের.?
আজ থেকে অর্ধশতকেরও বেশি সময় আগে তারুণ্যের অদম্য সঞ্জীবনী শক্তিতে উজ্জীবিত হয়েই তৎকালীন মৃত্যুঞ্জয়ী তরুণেরা মাতৃভাষার জন্য বুকের তাজা রক্তে রাজপথ করেছিল রঞ্জিত। ফাগুনের দিন ছিলো সেদিন কোকিলের কুহুতানে মুখরিত ছিলো চারিদিক কৃষ্ণচূড়া আগুন রঙে রাঙিয়েছিলো নিজেকে-মোহময় ছিলো সবকিছু। তবে সেদিন শুধু ফাগুন ছিলো না, দ্রোহের আগুন জ্বলেছিলো মানুষের অন্তরে মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা রক্ষার দাবিতে বজ্রমিছিল প্রকম্পিত করেছিলো রাজপথ। বুকের রক্ত দিয়ে নিজেদের স্বকীয়তা ও স্বাজাত্যবোধের মশাল জ্বালিয়ে প্রজ্বলিত করেছিলেন পুরা জাতিগোষ্ঠীকে। সেই মৃত্যুঞ্জয়ী তরুণদের রক্তের ছোঁয়া পেয়ে গোটা জাতি সেদিন জেগে উঠেছিল তার শেকড়ের টানে। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ এ দাবিতে বাঙালিরা যখন রাজপথে নেমে এসেছিল, তখন পাকিস্তানিরা তার জবাব দিয়েছিল বুলেটের আঘাতের মাধ্যমে।
পাকিস্তানিদের সৃষ্টি করা সাম্প্রদায়িকতা তাতে রুখতে পারেনি কোনো শক্তি, ব্যর্থ হয়েছিলো সেদিন পাকিরা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি সেদিন এক হয়ে একটিই প্রতিজ্ঞা করেছিল- মায়ের ভাষার সম্মান রাখার, নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করবার চেষ্টা। তাইতো সেদিন বাংলার দামাল ছেলে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের মতো অনেকের জীবন বিসর্জনের মধ্যদিয়ে বাঙালি তার নিজস্ব ভাষা, স্বকীয়তা এবং গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতিকে রক্ষা করেছিল। তাদের রক্তের বিনিময়ে এ বাংলায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা।
তাইতো একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সংস্কৃতির হৃৎপিন্ড। সে কারণেই মহান একুশের চেতনা এতটাই প্রবল ও ব্যাপক যে, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এমনকি প্রত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলেও সকল শিক্ষা, সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে ছোট্ট ছোট্ট কমলমতি শিশুসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ একুশের মধ্যরাত বা ভোরে শহীদ মিনারের পুষ্পস্তবক দিতে ভিড় জমান। আসলে যখন কোনো ভাবাদর্শ বা চেতনা গোটা জাতির অস্থিমজ্জার সঙ্গে মিশে যায়, তখন তার প্রকাশ রীতির রূপ ধারণ করতে পারে প্রতিটি শাখা প্রশাখায়। একুশের আনুষ্ঠানিকতাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা মনে করলে ভুল হবে। একুশ আমাদের শাশ্বত এক আলোকসুন্দর। সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, মাতৃভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও অসহযোগ আন্দোলন সহ অন্যান্য আন্দোলন, স্বাধীনতার ঘোষণা এ সবই তো একুশে চেতনার ফল। যা দেশের সর্বস্তরের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়।
আসুন, আমরা সবাই মিলে নতুন প্রজন্মের এ উন্মাদনা সামাল দেই। নতুবা একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া আর খালি পায়ে প্রভাতফেরী করা আমাদের লোক দেখানো নামান্তর হবে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ কথাটি শুধু মুখে নয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে প্রমাণ করতে হবে যে, রক্তের বিনিময়ে যে অর্জন তা আমরা বৃথা যেতে দেব না। মনে রাখতে হবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমরা যখনই পথ হারিয়ে অনিশ্চয়তার পানে হেঁটে চলেছি তখনই একুশ আমাদের পথ দেখিয়েছে। যুগিয়েছে প্রাপ্তির প্রত্যাশা ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সাহস। শিকড়ের প্রতি ভালোবাসার আরেক নামই দেশপ্রেম তথা আমাদের ভাষাশহিদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা অর্পণের সর্বোত্তম পন্থা। একুশ তুমি চির অমর,
তুমি আমাদের ভালোবাসা।
লেখক:  কবি ও সাংবাদিক
ট্যাগস :
আপডেট : ০৬:৩৩:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
২৩৬ বার পড়া হয়েছে

ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ এগিয়ে চলছে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে

আপডেট : ০৬:৩৩:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
ফেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে বাঙালির কাতরচিত্তে করুণ আহাজারির কথা, একুশের রক্তঝরা দিনের কথা- লাখো মানুষের প্রাণের আশা অর্জিত মাতৃভাষা বাংলার কথা। মনে পড়ে বায়ান্ন’র সেই করুণ কাহিনী আর রক্তাক্ত রাজপথের কথা, সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ আর’ও কত জনের আর্তচিৎকারের কথা যাদের রক্তের বিনিময়ে পেয়েছি প্রাণে’র ভাষা।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি’কে দাবিয়ে রাখার মূলমন্ত্র সেই রক্তক্ষয়ী মহাকৌশলের নিপীড়ন, নির্মম অত্যাচার, অনাচার, আর বঞ্চনার ইতিহাসের কথা। এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির লগ্ন থেকেই শুরু মানুষের মধ্যে মানুষের ভেদাভেদ, ক্ষমতার লোভ, হিংসা বিদ্বেষ। এক রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের শাসন করবার চেষ্টায় ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে করেছে যুদ্ধ। ঘটেছে জীবন নেওয়া দেওয়ার মতো অগুনতি ঘটনা। তবে নিজস্ব ভাষার জন্য জীবন দেওয়ার ইতিহাস একমাত্র আমাদের বাঙালির। একারনে’ই বাঙালি তথা বাংলাভাষীদের জন্য এ দিনটি একদিকে যেমন শোকের, অন্যদিকে তেমনি গৌরবেরও বটে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, একুশ আমাদের শতসহস্র চেতনা ও প্রেরণার উৎস; কিন্তু সমসাময়িক সমাজের দিকে তাকালে যে কারোরই মনে এই প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, অর্ধশতকের’ও বেশি সময় আগে আমাদের পূর্ববর্তী মৃত্যুঞ্জয়ী প্রজন্ম একুশের যে চেতনা আমাদের দিয়ে গিয়েছিল, তা আমরা জনমনে কত’টা সচেতন ভাবে তুলে ধরতে পেরেছি? যেসব তরুণ একসময় মা, মাটি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল, তাদের উত্তরসূরি বর্তমান প্রজন্ম আজ অনেকেই জানে’ই না একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কি দিবস! কেন একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এইতো সেদিন একুশের বইমেলায় গিয়ে আমার চোখে পড়ে এক ইউটিউবার এ প্রজন্মের কলেজ পড়ুয়া তরুণ তরুণীর কাছে জানতে চেয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারি কোন দিবস?
সঠিক উত্তর অনেকে’ই দিতে পারেনি! সে ভিডিওর দৃশ্য সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে সারা বিশ্ব দেখেছে। এ দায় কার.? বাঙালি জাতি হিসেবে এটা অত্যন্ত দুঃখের ও লজ্জার। ভাবতে কষ্ট হয়, এটি কি সেই বাংলাদেশ, যার জন্ম হয়েছে এক’টা জাতির  মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এদেশে একজন নাগরিক হিসেবে জন্মগ্রহণ করে স্বাধীনভাবে বাংলার সংস্কৃতিকে নামেমাত্র বুকে ধারণ করে খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত বিহঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছি, অথচ সেই দেশের জন্মের ইতিহাসকে আমরা ভুলতে বসেছি! এই তরুণ প্রজন্ম জানছে না বা সচেতন শিক্ষা ব্যবস্থা সঠিকভাবে জানাচ্ছে না‌। জানালেও জ্ঞানের পরিধি কম থাকায় মেমোরিতে ধরে রাখতে পারছে না। তার মূল কারণ এই প্রজন্মের অনেকেই অনলাইন সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার ও বিদেশি অপকালচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অনলাইন মেসেঞ্জার হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খুলে ফানি ভিডিও টিকটকে সেলিব্রেটি হওয়ার নেশায় মগ্ন। যার কারণে নিজের দেশের ইতিহাস জানার সময় কই.? তারা আজকে নিজের সংস্কৃতির চেয়ে বিদেশি অপসংস্কৃতি ও আকাশ সংস্কৃতিকে অতিমাত্রায় গ্রহণ করছে। ফলস্বরূপ নিজ দেশের লড়াই সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা ও স্বাধীনতার ইতিহাস না জানতে পারলে সমাজে সামাজিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা ক্রমেই বেড়ে যাবে। আমি দেখছি, ধীরে ধীরে সমাজের নতুন প্রজন্ম এগিয়ে চলছে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে। এগুলো কি আমাদের বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ কিংবা বায়ান্নোর ভাষা সৈনিকদের নজরে আসে না? নজরে আসে কি তাদের মা-বাবা ইস্কুল কলেজের শিক্ষকদের.?
আজ থেকে অর্ধশতকেরও বেশি সময় আগে তারুণ্যের অদম্য সঞ্জীবনী শক্তিতে উজ্জীবিত হয়েই তৎকালীন মৃত্যুঞ্জয়ী তরুণেরা মাতৃভাষার জন্য বুকের তাজা রক্তে রাজপথ করেছিল রঞ্জিত। ফাগুনের দিন ছিলো সেদিন কোকিলের কুহুতানে মুখরিত ছিলো চারিদিক কৃষ্ণচূড়া আগুন রঙে রাঙিয়েছিলো নিজেকে-মোহময় ছিলো সবকিছু। তবে সেদিন শুধু ফাগুন ছিলো না, দ্রোহের আগুন জ্বলেছিলো মানুষের অন্তরে মায়ের ভাষা, মুখের ভাষা রক্ষার দাবিতে বজ্রমিছিল প্রকম্পিত করেছিলো রাজপথ। বুকের রক্ত দিয়ে নিজেদের স্বকীয়তা ও স্বাজাত্যবোধের মশাল জ্বালিয়ে প্রজ্বলিত করেছিলেন পুরা জাতিগোষ্ঠীকে। সেই মৃত্যুঞ্জয়ী তরুণদের রক্তের ছোঁয়া পেয়ে গোটা জাতি সেদিন জেগে উঠেছিল তার শেকড়ের টানে। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ এ দাবিতে বাঙালিরা যখন রাজপথে নেমে এসেছিল, তখন পাকিস্তানিরা তার জবাব দিয়েছিল বুলেটের আঘাতের মাধ্যমে।
পাকিস্তানিদের সৃষ্টি করা সাম্প্রদায়িকতা তাতে রুখতে পারেনি কোনো শক্তি, ব্যর্থ হয়েছিলো সেদিন পাকিরা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি সেদিন এক হয়ে একটিই প্রতিজ্ঞা করেছিল- মায়ের ভাষার সম্মান রাখার, নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করবার চেষ্টা। তাইতো সেদিন বাংলার দামাল ছেলে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারের মতো অনেকের জীবন বিসর্জনের মধ্যদিয়ে বাঙালি তার নিজস্ব ভাষা, স্বকীয়তা এবং গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতিকে রক্ষা করেছিল। তাদের রক্তের বিনিময়ে এ বাংলায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা।
তাইতো একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সংস্কৃতির হৃৎপিন্ড। সে কারণেই মহান একুশের চেতনা এতটাই প্রবল ও ব্যাপক যে, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এমনকি প্রত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলেও সকল শিক্ষা, সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মিত হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে ছোট্ট ছোট্ট কমলমতি শিশুসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ একুশের মধ্যরাত বা ভোরে শহীদ মিনারের পুষ্পস্তবক দিতে ভিড় জমান। আসলে যখন কোনো ভাবাদর্শ বা চেতনা গোটা জাতির অস্থিমজ্জার সঙ্গে মিশে যায়, তখন তার প্রকাশ রীতির রূপ ধারণ করতে পারে প্রতিটি শাখা প্রশাখায়। একুশের আনুষ্ঠানিকতাকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা মনে করলে ভুল হবে। একুশ আমাদের শাশ্বত এক আলোকসুন্দর। সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, মাতৃভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও অসহযোগ আন্দোলন সহ অন্যান্য আন্দোলন, স্বাধীনতার ঘোষণা এ সবই তো একুশে চেতনার ফল। যা দেশের সর্বস্তরের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়।
আসুন, আমরা সবাই মিলে নতুন প্রজন্মের এ উন্মাদনা সামাল দেই। নতুবা একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া আর খালি পায়ে প্রভাতফেরী করা আমাদের লোক দেখানো নামান্তর হবে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’ কথাটি শুধু মুখে নয়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে প্রমাণ করতে হবে যে, রক্তের বিনিময়ে যে অর্জন তা আমরা বৃথা যেতে দেব না। মনে রাখতে হবে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমরা যখনই পথ হারিয়ে অনিশ্চয়তার পানে হেঁটে চলেছি তখনই একুশ আমাদের পথ দেখিয়েছে। যুগিয়েছে প্রাপ্তির প্রত্যাশা ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সাহস। শিকড়ের প্রতি ভালোবাসার আরেক নামই দেশপ্রেম তথা আমাদের ভাষাশহিদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা অর্পণের সর্বোত্তম পন্থা। একুশ তুমি চির অমর,
তুমি আমাদের ভালোবাসা।
লেখক:  কবি ও সাংবাদিক