০২:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০ আশ্বিন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বিজ্ঞপ্তি

বিহারিদের গিঞ্জি ঘরে বসবাস

মোহাম্মদ সাত্তার মিয়া

সরকারি তথ্যানুযায়ী, দেশটির ১৩টি জেলার ১১৬টি ক্যাম্পে এরা বসবাস করেন৷ এরমধ্যে ঢাকার ৪৫টি ক্যাম্পে ‘মানবেতর’ জীবনযাপন করছেন এক লাখের মতো (অবাঙালী) বিহারি জনগোষ্ঠীর মানুষ| পরিবারে সদস্য বেশি হলে বা রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে ঘুম বিসর্জন দেয়| শিশুকে কোলে নিয়ে রাতভর পায়চারি মা বাবা|

বিভিন্ন বই পুস্তক ও ইন্টারনেট ঘেঁটে জানাগেছে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে জন্ম নেয় পাকিস্তান| সে-সময় বিহার থেকে অনেক মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে অর্থাৎ এখনকার বাংলাদেশে চলে যান| শোষণ পোড়ন ও বঞ্চনার পিষ্ট বাঙালিরা ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং বহু মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেন| পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা ও জাতিগত সমস্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ| গন্ডির মধ্যে থেকেও বিহারিরা কখনো বাংলাদেশকে নিজের দেশ ভাবতে পারেনি তারা পাকিস্তানি উর্দু ভাষায় কথা বলতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

উর্দুভাষী বিহারীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিলেও পাকিস্তানে যেতে ব্যর্থ হন| ইসলামাবাদের পক্ষে সমর্থন জানানোয় বাংলাদেশিরাও তাদের আর বিশ্বাস করে না| ফলে সমাজে বিহারিদের অন্তর্ভূক্ত করতে কেউই কোনো পদক্ষেপ নেয়নি|

বিহারিদের ভাষ্য, ক্যাম্পগুলোর ছোট ছোট কক্ষে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়| একটু বৃষ্টি হলেই সেখানে নানান ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় তাদের৷ সত্য বলতে বাঙালীদের জন্য বিহারি জনগোষ্ঠী একটি অভিশাপ প্রায়ই! তবে বিহারীদের কিছু কিছু নেতারা মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে| একাধিক বাড়ী গাড়ী ছাড়াও তাদের রয়েছে নিজেস্ব বাহিনী| ক্যাম্পের ভিতরে মাদক কারবারি বা দাগী ক্রিমিনাল গ্রেফতারে বিহারিদের বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাদের|

সুপ্রিম কোর্টের ২০০৮ সালের একটি আদেশ অনুযায়ী, বিহারিদের জাতীয় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা থাকলেও তা হয়নি| বেশিরভাগ বিহারি বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য যোগ্য নন| কারণে তারা অস্থায়ী ক্যাম্পে বাস করেন| বাংলাদেশের নিয়মানুযায়ী, পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য আবদেনকারীকে তার স্থায়ী ঠিকানা সরবরাহ করতে হয়| তবে কোনো কোনো বিহারিরা টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট বাগিয়ে নিচ্ছে|

উর্দু-ভাষীদের পুনর্বাসন আন্দোলনের সভাপতি সাদাকাত খান গণমাধ্যমের সামনে বলেন, “আমরা পাঁচ দশক ধরে অমানবিক জীবনযাপন করছি, নূন্যতম সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি| আমাদের সন্তানদের মধ্যে কেবল পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পায়৷ আমরা আমাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষমতা অর্জন করতে চাই, আমরা আমাদের সন্তানদের স্কুলে যেতে দেখতে চাই|,

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে বিহারিদের অনেকেই বলে অভিযোগ রয়েছে৷ ফলে এদের এখনো বাংলাদেশের বিপক্ষের মানুষ বলেই বিবেচনা করা হয়|

কিছু সংখ্যক বিহারি চায় গিঞ্জি ঘরের ক্যাম্পগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস না করে সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে| বাংলাদেশবিরোধী বলে যে তকমা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে চায়|

সরকার সম্প্রতি বিহারিদের ঢাকা থেকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথা জানায়৷ সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে বহুতল ভবন তৈরি করে বিহারিদের রাখা হবে৷ বিহারিদের হস্তান্তর করা গেলে এলাকায় বাঙালিদের ঘরে চুরি ছিনতাই ও এলাকায় হাত বাড়ালে মাদক পাওয়া বন্ধ হবে বলে মনে করেন সুশীল সমাজ|

তবে বিহারীরা সরকারের এই পরিকল্পনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে৷ তারা মনে করেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে বিহারি জনগোষ্ঠীদের সমাজ থেকে আরো বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে| সরকার চায় বিহারিদের টুপ করে ধরে ঠুস করে উঁচু করে নির্ধারিত জায়গায় হস্তান্তর করতে |

ট্যাগস :
আপডেট : ১০:৫৯:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩
৩৫ বার পড়া হয়েছে

বিহারিদের গিঞ্জি ঘরে বসবাস

আপডেট : ১০:৫৯:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

সরকারি তথ্যানুযায়ী, দেশটির ১৩টি জেলার ১১৬টি ক্যাম্পে এরা বসবাস করেন৷ এরমধ্যে ঢাকার ৪৫টি ক্যাম্পে ‘মানবেতর’ জীবনযাপন করছেন এক লাখের মতো (অবাঙালী) বিহারি জনগোষ্ঠীর মানুষ| পরিবারে সদস্য বেশি হলে বা রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে ঘুম বিসর্জন দেয়| শিশুকে কোলে নিয়ে রাতভর পায়চারি মা বাবা|

বিভিন্ন বই পুস্তক ও ইন্টারনেট ঘেঁটে জানাগেছে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে জন্ম নেয় পাকিস্তান| সে-সময় বিহার থেকে অনেক মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে অর্থাৎ এখনকার বাংলাদেশে চলে যান| শোষণ পোড়ন ও বঞ্চনার পিষ্ট বাঙালিরা ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং বহু মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেন| পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা ও জাতিগত সমস্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ জড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ| গন্ডির মধ্যে থেকেও বিহারিরা কখনো বাংলাদেশকে নিজের দেশ ভাবতে পারেনি তারা পাকিস্তানি উর্দু ভাষায় কথা বলতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

উর্দুভাষী বিহারীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিলেও পাকিস্তানে যেতে ব্যর্থ হন| ইসলামাবাদের পক্ষে সমর্থন জানানোয় বাংলাদেশিরাও তাদের আর বিশ্বাস করে না| ফলে সমাজে বিহারিদের অন্তর্ভূক্ত করতে কেউই কোনো পদক্ষেপ নেয়নি|

বিহারিদের ভাষ্য, ক্যাম্পগুলোর ছোট ছোট কক্ষে তাদের মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়| একটু বৃষ্টি হলেই সেখানে নানান ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হয় তাদের৷ সত্য বলতে বাঙালীদের জন্য বিহারি জনগোষ্ঠী একটি অভিশাপ প্রায়ই! তবে বিহারীদের কিছু কিছু নেতারা মিরপুর ও মোহাম্মদপুরে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছে| একাধিক বাড়ী গাড়ী ছাড়াও তাদের রয়েছে নিজেস্ব বাহিনী| ক্যাম্পের ভিতরে মাদক কারবারি বা দাগী ক্রিমিনাল গ্রেফতারে বিহারিদের বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাদের|

সুপ্রিম কোর্টের ২০০৮ সালের একটি আদেশ অনুযায়ী, বিহারিদের জাতীয় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা থাকলেও তা হয়নি| বেশিরভাগ বিহারি বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য যোগ্য নন| কারণে তারা অস্থায়ী ক্যাম্পে বাস করেন| বাংলাদেশের নিয়মানুযায়ী, পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য আবদেনকারীকে তার স্থায়ী ঠিকানা সরবরাহ করতে হয়| তবে কোনো কোনো বিহারিরা টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট বাগিয়ে নিচ্ছে|

উর্দু-ভাষীদের পুনর্বাসন আন্দোলনের সভাপতি সাদাকাত খান গণমাধ্যমের সামনে বলেন, “আমরা পাঁচ দশক ধরে অমানবিক জীবনযাপন করছি, নূন্যতম সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি| আমাদের সন্তানদের মধ্যে কেবল পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পায়৷ আমরা আমাদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সক্ষমতা অর্জন করতে চাই, আমরা আমাদের সন্তানদের স্কুলে যেতে দেখতে চাই|,

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে বিহারিদের অনেকেই বলে অভিযোগ রয়েছে৷ ফলে এদের এখনো বাংলাদেশের বিপক্ষের মানুষ বলেই বিবেচনা করা হয়|

কিছু সংখ্যক বিহারি চায় গিঞ্জি ঘরের ক্যাম্পগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস না করে সমাজে অন্তর্ভুক্ত হতে| বাংলাদেশবিরোধী বলে যে তকমা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে চায়|

সরকার সম্প্রতি বিহারিদের ঢাকা থেকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরের পরিকল্পনার কথা জানায়৷ সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করে সেখানে বহুতল ভবন তৈরি করে বিহারিদের রাখা হবে৷ বিহারিদের হস্তান্তর করা গেলে এলাকায় বাঙালিদের ঘরে চুরি ছিনতাই ও এলাকায় হাত বাড়ালে মাদক পাওয়া বন্ধ হবে বলে মনে করেন সুশীল সমাজ|

তবে বিহারীরা সরকারের এই পরিকল্পনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে৷ তারা মনে করেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে বিহারি জনগোষ্ঠীদের সমাজ থেকে আরো বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হবে| সরকার চায় বিহারিদের টুপ করে ধরে ঠুস করে উঁচু করে নির্ধারিত জায়গায় হস্তান্তর করতে |