০৬:২৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ৩০ চৈত্র ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বিজ্ঞপ্তি

ভ্রমণকালিন ইসলামের যত নির্দেশনা

স্টাফ রিপোর্টার : জাকিরুল ইসলাম

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির কল্যাণেই পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। মানুষের কল্যাণেই দিয়েছেন বিধান, নিয়ম-নীতি। জীবনের তাগিদে মানুষের ভ্রমণ করতে হয় প্রতিনিয়তই। নানান কাজে এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতেই হয়। বর্তমানে সফর সহজ ও আরামদায়ক হলেও আগেকার সময়ে এমনটা ছিল না। মানুষের কষ্ট কমাতেই সফরে ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে।

কোনো ব্যক্তি তার অবস্থানস্থল থেকে ৪৮ মাইল বা ৭৮ কিলোমিটার দূরে সফরের নিয়তে বের হয়ে তার এলাকা পেরিয়ে গেলেই শরিয়তের দৃষ্টিতে সে মুসাফির হয়ে যায়। (জাওয়াহিরুল ফিক্বহ ১/৪৩৬, আহসানুল ফাতাওয়া ৪/১০৫) আর মুসাফিরের নামাজকে শরিয়তের পরিভাষায় কসর বলা হয়।

আরবি কসর শব্দের অর্থ হলো- কম করা, কমানো। শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি ৪৮ মাইল (৭৮ কিলোমিটার) বা তারও বেশি দূরত্বের ভ্রমণে নিজের বাসস্থান থেকে বের হন, তাহলে তিনি মুসাফির। আর তিনি যদি সেখানে ১৫ দিনের কম সময় থাকার নিয়ত করেন, তবে চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজ দুই রাকাত পড়বেন। এটাকেই কসর বলা হয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যখন জমিনে সফর করবে, তখন তোমাদের জন্য নামাজের কসর করায় কোনো আপত্তি নেই। (সুরা: নিসা, আয়াত : ১০)

বিমান ও পাহার-পর্বতের সফর

আকাশ পথে সফরের ক্ষেত্রেও একই দূরত্বের হিসাব করা হবে। অর্থাৎ স্থলভাগের ৭৮ কিলোমিটার পরিমাণ দূরত্বের সফর হলে আকাশপথের মুসাফির হবে। (রদ্দুল মুহতার ১/৭৩৫) অনুরূপ পার্বত্য এলাকায় সফরের ক্ষেত্রেও সমতলে চলার হিসেবেই হবে, অর্থাৎ পাহাড়ের উঁচু-নীচু ঢালুসহ দূরত্বের হিসাব হবে। (ফাতহুল ক্বাদির ২/৩১, আল বাহরুর রায়েক ২/২২৯)

মুসাফিরের বিধান

সফরকারীর জন্য শরিয়তের বিধি-বিধানে শিথিলতা রয়েছে। মুসাফির চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজগুলো দুই রাকাত আদায় করবে। সফরে রোজা না রেখে পরবর্তী সময়ে কাজা করলেও চলবে। অনুরূপভাবে চামড়ার বা যে মোজায় পানি পৌঁছে না এমন মোজায় মাসেহ করতে পারবে, ইত্যাদি।

এ বিষয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের নবীর জবানে নামাজকে মুকিম অবস্থায় চার রাকাত ও সফর অবস্থায় দুই রাকাত ফরজ করেছেন।’ (মুসলিম, হাদিস নং: ৬৮৭)

 

সফর অবস্থায় নামাজ কসর করা সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে। এ সব হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত যে, রাসুলুল্লাহ সা. সফর অবস্থায় সর্বদা নামাজ কসর পড়েছেন। চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজ দুই রাকাত আদায় করেছেন। মাগরিব, বিতর ও ফজরের নামাজ পূর্ণই আদায় করতে হবে, এ নামাজগুলো কসর হয় না। তেমনিভাবে সুন্নাত নামাজেরও কসর হয় না। তাই সুন্নাত পড়লে পুরোটাই পড়বে।

স্থায়ী বসাবাসের স্থান পাল্টালে মুসাফিরের বিধান

কোনো জায়গায় ১৫ দিন বা ততধিক অবস্থানের নিয়ত করলে সে সেখানে মুকিম হয়ে যাবে। সেখান থেকে সামানা-পত্রসহ প্রস্থানের আগ পর্যন্ত সেখানে পূর্ণ নামাজ পড়বে এবং মুকিমের বিধান জারি থাকবে। (বাদায়েউস সানায়ে ১/১০৪)

স্থায়ী আবাসস্থল পরিবর্তন করে অন্যস্থানে মূল আবাস গড়লে স্থায়ী বসবাসের জন্য সেখানে না যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে আগের অবস্থানস্থল মৌলিক আবাসন হিসেবে গণ্য হবে না। এমনকি সেখানে তার মালিকানা জায়গা-জমিন থাকলেও নয়, বরং সেখানেও সফরের সীমানা অতিক্রম করে গেলে মুসাফিরই থাকবে। (আল মাবসূত, সারাখসি ১/২৫২)

 

কেউ যদি তার গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় এসে জায়গা জমিন ক্রয় করে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন, তাহলে সে গ্রামে ১৫ দিনের কম সময়ের জন্য গেলে মুসাফির হিসেবে গণ্য হবে। দলিল : ১. ফাতওয়ায়ে শামী-২/৬১৪, ২. তাবয়ীনুল হাকায়েক-১/৫১৭, ৩. আল বাহরুর রায়েক-২/২৩৬, ৪. খাইরুল ফাতওয়া- ২/৬৮২-৬৮৩, ৫. আহসানুল ফাতওয়া-৪/৭৫-৭৬, ৬. সুনানে আবু দাউদ-১/৬১৪।

সফরে সুন্নাত পড়ার বিধান

সফর অব্স্থায় তাড়াহুড়া থাকলে ফজরের সুন্নাত ছাড়া অন্যান্য সুন্নাতে মুয়াক্কাদা না পড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে স্বাভাবিক ও স্থির অবস্থায় সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পড়তে হবে। (এলাউস্ সুনান ৭/১৯১, রদ্দুল মুহতার ১/৭৪২) সফর অবস্থায় তাড়াহুড়া ও ব্যস্ততার সময় সুন্নত পড়বে না। আর গন্তব্যে পৌঁছার পর সুন্নত নামাজ পড়া উত্তম। এভাবেই আল্লাহতায়ালা সফর অবস্থায় মুসাফিরের নামাজ ও অন্যান্য বিধান শিথিল করে নির্দেশনা দিয়েছেন।

ট্যাগস :
আপডেট : ১২:০২:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ অক্টোবর ২০২৩
৪৩৮ বার পড়া হয়েছে

ভ্রমণকালিন ইসলামের যত নির্দেশনা

আপডেট : ১২:০২:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ অক্টোবর ২০২৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির কল্যাণেই পৃথিবীর সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। মানুষের কল্যাণেই দিয়েছেন বিধান, নিয়ম-নীতি। জীবনের তাগিদে মানুষের ভ্রমণ করতে হয় প্রতিনিয়তই। নানান কাজে এক শহর থেকে অন্য শহরে যেতেই হয়। বর্তমানে সফর সহজ ও আরামদায়ক হলেও আগেকার সময়ে এমনটা ছিল না। মানুষের কষ্ট কমাতেই সফরে ইসলামের নির্দেশনা রয়েছে।

কোনো ব্যক্তি তার অবস্থানস্থল থেকে ৪৮ মাইল বা ৭৮ কিলোমিটার দূরে সফরের নিয়তে বের হয়ে তার এলাকা পেরিয়ে গেলেই শরিয়তের দৃষ্টিতে সে মুসাফির হয়ে যায়। (জাওয়াহিরুল ফিক্বহ ১/৪৩৬, আহসানুল ফাতাওয়া ৪/১০৫) আর মুসাফিরের নামাজকে শরিয়তের পরিভাষায় কসর বলা হয়।

আরবি কসর শব্দের অর্থ হলো- কম করা, কমানো। শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি ৪৮ মাইল (৭৮ কিলোমিটার) বা তারও বেশি দূরত্বের ভ্রমণে নিজের বাসস্থান থেকে বের হন, তাহলে তিনি মুসাফির। আর তিনি যদি সেখানে ১৫ দিনের কম সময় থাকার নিয়ত করেন, তবে চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজ দুই রাকাত পড়বেন। এটাকেই কসর বলা হয়। কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যখন জমিনে সফর করবে, তখন তোমাদের জন্য নামাজের কসর করায় কোনো আপত্তি নেই। (সুরা: নিসা, আয়াত : ১০)

বিমান ও পাহার-পর্বতের সফর

আকাশ পথে সফরের ক্ষেত্রেও একই দূরত্বের হিসাব করা হবে। অর্থাৎ স্থলভাগের ৭৮ কিলোমিটার পরিমাণ দূরত্বের সফর হলে আকাশপথের মুসাফির হবে। (রদ্দুল মুহতার ১/৭৩৫) অনুরূপ পার্বত্য এলাকায় সফরের ক্ষেত্রেও সমতলে চলার হিসেবেই হবে, অর্থাৎ পাহাড়ের উঁচু-নীচু ঢালুসহ দূরত্বের হিসাব হবে। (ফাতহুল ক্বাদির ২/৩১, আল বাহরুর রায়েক ২/২২৯)

মুসাফিরের বিধান

সফরকারীর জন্য শরিয়তের বিধি-বিধানে শিথিলতা রয়েছে। মুসাফির চার রাকাতবিশিষ্ট ফরজ নামাজগুলো দুই রাকাত আদায় করবে। সফরে রোজা না রেখে পরবর্তী সময়ে কাজা করলেও চলবে। অনুরূপভাবে চামড়ার বা যে মোজায় পানি পৌঁছে না এমন মোজায় মাসেহ করতে পারবে, ইত্যাদি।

এ বিষয়ে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের নবীর জবানে নামাজকে মুকিম অবস্থায় চার রাকাত ও সফর অবস্থায় দুই রাকাত ফরজ করেছেন।’ (মুসলিম, হাদিস নং: ৬৮৭)

 

সফর অবস্থায় নামাজ কসর করা সম্পর্কে অনেক হাদিস রয়েছে। এ সব হাদিস দ্বারা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত যে, রাসুলুল্লাহ সা. সফর অবস্থায় সর্বদা নামাজ কসর পড়েছেন। চার রাকাতবিশিষ্ট নামাজ দুই রাকাত আদায় করেছেন। মাগরিব, বিতর ও ফজরের নামাজ পূর্ণই আদায় করতে হবে, এ নামাজগুলো কসর হয় না। তেমনিভাবে সুন্নাত নামাজেরও কসর হয় না। তাই সুন্নাত পড়লে পুরোটাই পড়বে।

স্থায়ী বসাবাসের স্থান পাল্টালে মুসাফিরের বিধান

কোনো জায়গায় ১৫ দিন বা ততধিক অবস্থানের নিয়ত করলে সে সেখানে মুকিম হয়ে যাবে। সেখান থেকে সামানা-পত্রসহ প্রস্থানের আগ পর্যন্ত সেখানে পূর্ণ নামাজ পড়বে এবং মুকিমের বিধান জারি থাকবে। (বাদায়েউস সানায়ে ১/১০৪)

স্থায়ী আবাসস্থল পরিবর্তন করে অন্যস্থানে মূল আবাস গড়লে স্থায়ী বসবাসের জন্য সেখানে না যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে আগের অবস্থানস্থল মৌলিক আবাসন হিসেবে গণ্য হবে না। এমনকি সেখানে তার মালিকানা জায়গা-জমিন থাকলেও নয়, বরং সেখানেও সফরের সীমানা অতিক্রম করে গেলে মুসাফিরই থাকবে। (আল মাবসূত, সারাখসি ১/২৫২)

 

কেউ যদি তার গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় এসে জায়গা জমিন ক্রয় করে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন, তাহলে সে গ্রামে ১৫ দিনের কম সময়ের জন্য গেলে মুসাফির হিসেবে গণ্য হবে। দলিল : ১. ফাতওয়ায়ে শামী-২/৬১৪, ২. তাবয়ীনুল হাকায়েক-১/৫১৭, ৩. আল বাহরুর রায়েক-২/২৩৬, ৪. খাইরুল ফাতওয়া- ২/৬৮২-৬৮৩, ৫. আহসানুল ফাতওয়া-৪/৭৫-৭৬, ৬. সুনানে আবু দাউদ-১/৬১৪।

সফরে সুন্নাত পড়ার বিধান

সফর অব্স্থায় তাড়াহুড়া থাকলে ফজরের সুন্নাত ছাড়া অন্যান্য সুন্নাতে মুয়াক্কাদা না পড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে স্বাভাবিক ও স্থির অবস্থায় সুন্নাতে মুয়াক্কাদা পড়তে হবে। (এলাউস্ সুনান ৭/১৯১, রদ্দুল মুহতার ১/৭৪২) সফর অবস্থায় তাড়াহুড়া ও ব্যস্ততার সময় সুন্নত পড়বে না। আর গন্তব্যে পৌঁছার পর সুন্নত নামাজ পড়া উত্তম। এভাবেই আল্লাহতায়ালা সফর অবস্থায় মুসাফিরের নামাজ ও অন্যান্য বিধান শিথিল করে নির্দেশনা দিয়েছেন।