রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:৫৬ পূর্বাহ্ন

বিজ্ঞপ্তি :
দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার পত্রিকাতে আপনাকে স্বাগতম! বাংলাদেশ সমাচার পড়ুন,বিজ্ঞাপন দিন সহযোগী হোন! বাংলাদেশ সমাচার পড়ুন বেকারত্ব দূর করুন ।

তিন কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে শাহজীবাজার রাবার বাগান

তিন কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শাহজীবাজার রাবার বাগান। প্রতি বছর কোটি কোটি লোকসানের কারণে একদিকে যেমন বকেয়া পড়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন-ভাতা অন্যদিকে কর্মসংস্থান হারিয়ে বেকার হওয়ার পথে বাগানে কর্মরত ৩শ’ কর্মকর্তা-কর্মচারি। কর্তৃপক্ষ বলছে লোকসান কমাতে ও বাগান টিকিয়ে রাখতে কাজ চলছে।
বাগান সূত্রে জানা যায়, ২১শ’ ৪ একর জায়গা নিয়ে ৮০ দশকে প্রতিষ্ঠাকরা হয় হবিগঞ্জের শাহজীবাজার রাবার বাগান। এক সময় বাগানটি লাভজনক থাকলেও ২০১৩ সাল থেকে লোকসানের দিকে চলে যায়। মূলত দীর্ঘ ১০ বছর আগে গাছের জীবনচক্র শেষ হওয়া, আন্তর্জাতিক বাজারের রাবারের দাম কমে যাওয়া ও সঠিক পরিচর্চার অভাবে এখন ধ্বংস হওয়ার প্রহর গুণছে বাগানটি। অথচ এখনও তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না কর্তৃপক্ষ। প্রতি বছরই প্রায় ২ কোটি টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে।
তথ্যমতে,২০১৩ সাল থেকে লোকসান শুরু হয় বাগানের। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে লোকসানের পরিমাণ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, ১৪-১৫ অর্থবছরে ৪ কোটি ৭০ লাখ, ১৫-১৬ অর্থ বছরে ৪ কোটি ২৬ লাখ, ১৬-১৭ অর্থবছরে ৪ কোটি, ১৭-১৮ অর্থ বছরে ৩ কোটি ৬৪ লাখ এবং বিগত ১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ ৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা লোকসান গুণতে হয়েছে। এ বছর লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছে বাগান কর্তৃপক্ষ।
লোকসানের জন্য কর্তৃপক্ষ গাছের জীবনচক্র শেষ হয়ে যাওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারের রাবারের দাম কমে যাওয়াকে দায়ি করলেও পরিচর্জার অভাব থাকার বিষয়টি স্বীকার করতে রাজি নয়। কর্তৃপক্ষ বলছে-গেলো ৭ বছরে কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন-ভাতা বেড়েছে দ্বীগুণ। অথচ সেই তুলনায় রাবারের দাম বৃদ্ধি পাওয়াতো দূরের কথা উল্টো কয়েকগুণ কমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন-নতুন গাছ লাগালেও অন্তত ১৫/২০ বছর সম্পূর্ণভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকবে বাগানটি। আর যে পরিমাণ লোকসানের আসবে তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে অন্তত ৩০/৩৫ বছর। তাদের দাবি- দ্রæত গতিতে কাজ করলেও সম্পূর্ণ বাগানটি পরিস্কার করতেই সময় লাগবে অন্তত ৪/৫ বছর। এরপর পুরোপুরিভাবে উৎপাদনে যেতে সময় লাগবে আরও ১২/১৫ বছর। এই সময় শ্রমিকসহ বিভিন্নভাবে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে তা পুষিয়ে উঠতে ৩০/৩৫ বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে আগামী ৩৫/৪০ বছরের আগে লাভের মূখ দেখবে না শাহজীবাজার রাবার বাগান।
এদিকে, অব্যাহত লোকসানের কারণে বকেয়া পড়েছে কর্মকর্তা-কর্মকচারিদের বেতন-ভাতা। বাগানে নিয়োজিত ৩শ’ কর্মচারির বেতন কয়েক কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে আবাসনসহ নিরাপত্তা সমস্যাও। কর্মকর্তা-কর্মচারিরা বাগান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে বসবাস করায় ব্যহত হচ্ছে উৎপাদন। পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
ফয়জুল মিয়া বলেন, ‘প্রায় দেড় লাখ টাকার উপরে বেতন পাওয়া রয়েছে। দেবে দেবে বলেও দিচ্ছে না। ফলে খারাপভাবে আমাদের দিন কাটছে। ছেলে মেয়ে নিয়ে খুব কষ্ট করে দিন কাটাতে হচ্ছে। ‘শুধু বেতন-ভাতা বকেয়া নয়। আমাদের বাগানে থাকার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। যার কারণে অনেক কষ্ট করে কষ উত্তোলন করতে হচ্ছে।’
শাহজীবাজার রাবার বাগান কর্মচারি ইউনিয়ন সমিতির সভাপতি মো. আল আমীন বলেন, ‘কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বকেয়া পড়েছে প্রায় ৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। একেক জন কর্মচারির বকেয়ার পরিমাণ দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। এসব দ্রæত পরিশোধসহ আবাসিক ব্যবস্থা, বাগানে মেডিকেল টিম রাখা ও নিরাপত্তা জোরদারসহ সকল সমস্যা সমাধান করা প্রয়োজন। এছাড়া বাগান যেন আরো বেশি উৎপাদনের দিকে যায় এর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরী।’
বাগান ব্যবস্থাপক মোঃ জুলফিকার আলী জানান ১৯৮০-৮৭ইং সময়কালে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বাবশিউক) উদ্যোগে শাহজীবাজারের পাহাড়ি ভূমিতে রাবার বাগানটি গড়ে তোলা হয়। ধীরে ধীরে বাগানটির পরিসর বাড়ে। লোকবলও বাড়ে। বর্তমানে বাগানটিতে ২৪৭ জন টেপার রাবার গাছ থেকে কষ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।
ব্যবস্থাপক আরও জানান বাগানটির ২০২১-২২ অর্থবছরে বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫শ টন। উৎপাদন হয়েছিল ৪ শ ৫৫ টন। চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত উৎপাদন ৫ টন বেড়েছে। তবে ৫’শ টন রাবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে তিনি ধারণা করছেন। এজন্য তিনি রাবার গাছের জীবনচক্র হারানোকেই দায়ী করেছেন। জীবনচক্র হারানো রাবার গাছ থেকে কাঙ্খিত পরিমান রাবারের কষ পাওয়া অসম্ভব উল্লেখ করে তিনি জানান যুগযুগ ধরে জীবনচক্র হারানো পুরাতন গাছের উপর নির্ভর করেই বাগানটি চলছে। বর্তমানে বাগানটিতে মান্ধাতা আমলের আরআর-৬০০ জাতের রাবার গাছের চারাই লাগানো আছে। বাগানে রাবার গাছ থেকে প্রাপ্ত কষ প্রসেসিং করে বাগানের কারখানাতেই রাবার শিট তৈরীর পর সেগুলো ভালভাবে শুকিয়ে ঢাকার মীরপুরে অবস্থিত বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের নিজস্ব সেলস সেন্টারে পাঠানোর পর বিভিন্ন রাবার ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি দরপত্রের মাধ্যমে কিনে নিয়ে তাদের চাহিদামত বিভিন্ন রাবার-সামগ্রী তৈরী ও বিপনন করে থাকে। বাগানে সবকিছু মিলিয়ে ১ কেজি কাঁচা রাবার(রাবার শিট) উৎপাদন করতে সর্বনিম্ন খরচ পড়ে ৩ শ টাকা। কিন্তু সেলস সেন্টারে সেই রাবার সর্বোচ্চ ১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রী হয় বলে জানান ব্যবস্থাপক।
তার দেওয়া তথ্যমতে বাগানের রাবার গাছগুলোর প্রতিটি থেকে বছরে গড়ে প্রায় সাড়ে আট থেকে ৯ কেজি রাবার সংগ্রহ করা যায়। সে হিসাবে গড়ে বছরে বাগানটির রাবার বিক্রী থেকে আয় প্রায় ১০ কোটি টাকা।কিন্তু কর্মকর্তা কর্মচারীর বেতন ভাতা ও বাগান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাবদ প্রতিবছর প্রায় ১২ কোটি টাকা খরচ হয়।একারনে বাগানটি গড়ে প্রতিবছর প্রায় ২ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে। তবে বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের আওতাধীন অন্যান্য রাবার বাগানের উৎপাদন বেশী হওয়ায় এ লোকসানের কারনে তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না বলেও তিনি দাবী করেন।
একটি সূত্র জানিয়েছে হারানো গাছের পরিবর্তে নতুন গাছ লাগানোর মাধ্যমে রাবার বাগানটির উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি চীনা কোম্পানীর সাথে তারা কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছেন। শীঘ্রই এ ব্যাপারে অগ্রগতি হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

বিজ্ঞপ্তি

©দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার 2022All rights reserved