মো. জাহিদুর রহমান >>
পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বি এম ইউসুফ আলীকে শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করেছে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা। ১০ ডিসেম্বর রাতে দিলকুশায় পপুলার লাইফের প্রধান কার্যালয়ে নিজ কক্ষে তিনি এ ঘটনার শিকার হন।
এ সময় কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিএম শওকত আলীসহ আরও কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তাও হামলাকারীদের লাঞ্চনার শিকার হন। তবে হামলাকারীদের পরিচয় জানা যায়নি। খবর নির্ভরযোগ্য সূত্রের।জানা গেছে, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির এমডি বি এম ইউসুফ আলী গতকাল সন্ধ্যা ৬ টার পর অফিসে আসেন। অফিসে নিজ কক্ষে বসে তার কোম্পানির কোম্পানি সেক্রেটারি হেলাল কবির এবং অপর কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় তার খুব ঘনিষ্ট ও বিশ্বস্ত দু’জন সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন।
সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে ৬ টার দিকে একদল বিক্ষুব্ধ লোক ঝটিকা গতিতে তার কক্ষে প্রবেশ করে প্রথমে তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। তারা তাকে পতিত স্বৈর শাসক শেখ হাসিনার দোসর উল্লেখ করে বলে, এই কোম্পানির লক্ষ লক্ষ গ্রাহকের প্রিমিয়ামের শত শত কোটি টাকা লুট করে তুই দেশে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছিস, অথচ গ্রাহকরা মেয়াদ শেষে বীমা দাবীর জন্য দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তোর অফিসে এস বসে থাকছে কিন্তু তারা তাদের টাকা পাচ্ছে না। তাদের চোখের জল দেখে ও এই করুন কাহিনী শুনে সাধারণ মানুষের কান্না আসলেও তোর হৃদয় স্পর্শ করে নাই। তোকে আমরা ছাড়ব না। তোর সব সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা দিয়ে এই অফিস থেকে যাবি, এর আগে আমরা কোন ভাবইে তোকে যেতে দিব না। দু’পক্ষের বাক বিতন্ডার এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধ আরও কিছু লোক কক্ষে প্রবেশ করে তাকে এলোপাতারি কিল ঘুষি মারতে থাকে।
এ সময় ছোট ভাই ও কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিএম শওকত আলী তাকে বাচানোর চেষ্টাকালে তাকেও মারধর করা হয়। এ সময় বিএম ইউসুফ আলী কৌশলে অফিস থেকে পালিয়ে বেরিয়ে যান। তার সাথে দুই সম্পাদকও বেরিয়ে যান। এ ঘটনায় গভীর রাত পযর্ন্ত এলাকায় টানা উত্তেজনা বিরাজ করে। জানা গেছে, পপুলারের এমডি অনেক দিন নিয়মিত অফিস করেন না। তিনি এ ধরনের হামলার শিকার হতে পারেন, এ সন্দেহ তার মধ্যে ছিল। তিনি সরকার পরিবর্তনের পর জুলাই বিপ্লবের ছাত্র জনতার তোপের মুখে পড়েন। এ কারণে তিনি সবসময় নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন। তিনি খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অফিসে আসেন নাই। অফিসে আসলেও খুব গোপনীয়তা রক্ষা করে সন্ধ্যার কিছু আগে অথবা সন্ধ্যার কিছু পরে আসতেন। তাও হয়তবা সপ্তাহে দু’একদিন। অফিসে আধা ঘন্টা এক ঘন্টা থেকে আবার তড়িঘড়ি করে চলে যেতেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, ছাত্র আন্দোলন দমনে ছাত্রলীগ যুবলীগকে বিপুল পরিমান টাকা দিয়েছেন, এ টাকা পপুলার লাইফের গ্রাহকের। বিগত ষোল বছর ধরে তিনি পপুলার লাইফের এমডি পদে বহাল রয়েছেন, পপুলারকে তার পারিবারিক কোম্পানিতে পরিণত করেছেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনেক অভিযোগ রয়েছে, ব্যাপারে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। এ জন্য তারা বিএম ইউছুফ আলীকে আর পপুলার লাইফে দেখতে চান না। শেখ হাসিনা সরকারে উচ্চ পযার্য়ের নেতাদের এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে তার গভীর সম্পর্ক ও যোগাযোগ থাকায় তিনি কখনো ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। তিনি বীমা আইন লংঘন করে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে সরকারের অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ১৬ বছর পপুলার লাইফের এমডির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ সময়ে তিনি কয়েক শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন পপুলার লাইফ থেকে, যার পুরোটাই গ্রাহকের টাকা। এই টাকা দিয়ে দেশে বিদেশে বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছেন। পপুলার লাইফের গ্রাহকের টাকা দিয়ে বীমা আইনের তোয়াক্কা না করে এনআরবি লাইফের পরিচালক হয়েছেন।
তিনি বর্তমানে কোম্পানিটির দশ শতাংশ শেয়ারেরও মালিক। তার এ ধরনের আইন লংঘন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার রহস্যজনক নিরবতা ও তা়র সীমাহীন দুর্নীতি নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক নিয়ে দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার পত্রিকায় একাধিক অনুসন্ধ্যানি প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন নড়ে চড়ে বসছে। বিষয়টি উচ্চ আদালত পযর্ন্ত গড়িয়েছে। এক বীমা গ্রাহকের করা রীটের প্রেক্ষিতে এ ঘটনায় হাইকোর্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে কারণ দশার্নোর নোটিশ দিয়ে রুল জারি করে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলেছে। জানা গেছে, IDRA রুলের জবাব দিতে প্রস্তুতি নিয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর আদালত ছুটি হচ্ছে, ছুটির পর এই রুলের শুনানি হতে পারে। আদালতের হাতে এখন বিএম ইউসূফ আলীর ভাগ্য। এ অবস্থায় নিজ অফিসে বিক্ষুব্ধ গ্রাহক জনতার হাতে লঞ্চিত হলেন পপুলার লাইফের এমডি বিএম ইউসূফ আলী।
