মো. ছাব্বির হোসাইন
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক মোড় নিয়েছে। ২০১৮ সালের আলোচিত "কোটা সংস্কার" দাবির রেশ ধরে আবারও রাস্তায় নামে দেশের ছাত্রসমাজ। তবে এবার তাদের প্রতিরোধ আরও কঠোর, দাবি আরও স্পষ্ট, আর প্রতিক্রিয়া আরও বিস্ফোরক। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়, এই আন্দোলন শুধু একটি নীতিগত দাবি নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে সরকারের উপর ছাত্র-জনতার আস্থার সংকটের প্রতিচ্ছবি।
আন্দোলনের পটভূমি:
২০১৮ সালে ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চাকরিতে ৫৬% কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। সরকার পরে জানিয়েছিল, কোটার বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রশাসনিক পর্যায়ে কোটার কিছু অংশ তখনও কার্যকর, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটার আওতায় ব্যাপক অনিয়ম ও অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের এক রায়ে বলা হয়, ২০১৮ সালের কোটাবাতিলের সিদ্ধান্ত "অবৈধ" এবং পূর্বের কোটাব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়। এই রায়ের পরপরই শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের মূল দাবি:
শিক্ষার্থীরা সরাসরি পাঁচটি দাবি তোলে:
১. সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা।
২.অতিরিক্ত কোটা বাতিল, সর্বোচ্চ ১০%-এর মধ্যে সীমিত রাখা।
৩. প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য যুক্তিসংগত সংরক্ষণ।
৪. কোটার কারণে যোগ্য প্রার্থীর বঞ্চনার অবসান।
৫. আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হয়রানি ও হামলার বিচার।
সরকারের ভূমিকা ও সংকট:
সরকার প্রথমদিকে হাইকোর্টের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার কথা বললেও পরবর্তীতে ছাত্রদের দাবি দমনে কঠোর অবস্থান নেয়। হাইকোর্টের রায়ের পর সরকার নীরব থাকে। এসময় কোনও নীতিগত ব্যাখ্যা বা অবস্থান নেয়নি। এই নীরবতা ছাত্র সমাজে অনাস্থা তৈরি করে। এরপর ছাত্রদের আন্দোলনকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে প্রচার করে। পুলিশ ও ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে দমন শুরু করে। ইন্টারনেট শাটডাউন, গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেটের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের দমন করার চেষ্টা চালায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, "আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে হবে।", "সুযোগ সুবিধা কি রাজাকারের সন্তানরা পাবে?" এই বক্তব্য ছাত্রসমাজে আরও ক্ষোভ বাড়ায়।
আন্দোলনের বিস্তার ও দমন-পীড়ন:
আন্দোলন সূচনা হয় ৬ জুন ২০২৪, হাইকোর্ট রায়ের প্রত্যুত্তরে। ১ জুলাই ২০২৪, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ সর্বত্র আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। ১৫ জুলাই ২০২৪ থেকে আন্দোলন চরমে পৌঁছে যায়। পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলার ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়-এর ছাত্র অবু সাঈদ পুলিশ গুলিতে নিহত হন, ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন আরও সহিংস হয়। সারাদেশে দফায় দফায় ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়। শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট প্রয়োগ এবং কোথাও কোথাও সরাসরি গুলি করা হয়। এতে সারাদেশসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থান রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের থেকে দফায় দফায় দাবি আসতে থাকে। কখনো ৫ দফা, কখনো ৯ দফা। এরপরও যখন তাদের দাবি না মানে- তখন তারা সরকার পতনের ১ দফা ঘোষণা করে ৫ আগস্ট ২০২৪, 'লংমার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই ঘোষণার পর সারাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ছাত্রজনতাকে আর দমিয়ে রাখা যাবে না, সেনাপ্রধানের এই কথা শোনার পর শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান।
জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া:
এই আন্দোলনে অংশ নেয় বিভিন্ন বাম ছাত্রসংগঠন, নাগরিক সমাজ, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, সাধারণ জনগণ ও সাংস্কৃতিক জোট। বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য বিরোধীদল সরাসরি মাঠে সক্রিয় না থাকার কথা বললেও বক্তব্যে তারা ছাত্রদের প্রতি সংহতি জানায়। মূলত তারাও ছাত্রদের সাথে একত্র হয়ে সরকার পতনের জন্য কাজ করেছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় সরকারবিরোধী তীব্র সমালোচনা। অনেকে একে "মিনিয়েচার গণআন্দোলন" বলেও আখ্যা দেন।
বিশ্লেষণ: কোটা নাকি ক্ষমতা?
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪-এর এই গণআন্দোলন কেবল কোটার বিরুদ্ধে নয়, এটি একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অব্যক্ত ক্ষোভের বিস্ফোরণ। যেখানে মেধার জায়গায় স্বজনপ্রীতি, ন্যায়ের জায়গায় পক্ষপাত, শিক্ষার জায়গায় পেশিশক্তি এবং ভবিষ্যতের জায়গায় অনিশ্চয়তা।
মন্তব্য:
এই আন্দোলন শেখায়, ছাত্রসমাজ কখনো নীরব থাকে না। যখন রাষ্ট্র মেধাকে অবজ্ঞা করে, গণতন্ত্রের নামে পক্ষপাত চালায়, তখনই তারা জেগে ওঠে। কোটা আন্দোলন শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এটি ছিল একটি তরুণ প্রজন্মের ন্যায্য দাবির আন্দোলন, যা ক্ষমতাসীন ও সৈরাচারী শাসকের পতনে রূপান্তরিত হয়। যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল "কোটা চাই না" বলে, তা শেষ হয়েছিল "সরকার চাই না" দিয়ে।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
