ঢাকা | বঙ্গাব্দ

আহমদ ছফা ও প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক

  • আপলোড তারিখঃ 20-08-2025 ইং |
  • নিউজটি দেখেছেনঃ 2314692 জন
আহমদ ছফা ও প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক ছবির ক্যাপশন: সংগৃহীত

শামীম আহমেদ 

চট্টগ্রামে ১৯৪৩ সালে জন্ম নেওয়া আহমদ ছফা লেখক, ঔপন্যাসিক, কবি, চিন্তাবিদ ও গণবুদ্ধিজীবী। ছফাকে নিয়ে লেখা বা বলার নতুন করে কিছু নেই। ছফা তার লেখার মাধ্যমে পাঠক সমাজকে যেভাবে আন্দোলিত করতে পেরেছেন, খুব কম লেখকের পক্ষে তা সম্ভব হয়েছে। তার সৃষ্টিকর্মের মাঝে গুরু প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে লেখা “যদ্যপি আমার গুরু” অন্যতম। গুরু-শিষ্যের আলোচনা উঠে এসেছে দেশের সমকালীন প্রেক্ষাপট, সমাজ, রাজনীতি, বিট্রিশ ভারত থেকে বর্তমান রাজনৈতিক -সামাজিক পরিস্থিতি, সাহিত্য, হোমড়াচোমরা বিভিন্ন ব্যক্তিদের সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা, দুনিয়ার বিভিন্ন ঘটনা ও ব্যক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত। বইয়ে আহমদ ছফা স্মৃতি সাঁতরে স্যারের কথা যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা সত্যি বিষ্ময়কর। জ্ঞানতাপস রাজ্জাক স্যারের জ্ঞানের প্রগাঢ়তা ও কথার ক্ষুরধার যুক্তি এবং দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানাশোনা পরিমাণ  ছিলো সমুদ্র সমতুল্য। রাজ্জাক স্যারকে তুলনা করা হতো ডায়োজিনিসের সাথে। শুধু দেশেই নয় বিদেশেরও অনেক গুণীজন তার প্রতি বিশেষভাবে মুগ্ধ ছিলেন। ইলাস্টেটেড পত্রিকায় তাকে নিয়ে কভার ষ্টোরি করেছিলো এবং তাকে বাংলার ডায়োজিনিস বলে অভিহিত করা হয়। আহমদ ছফার বয়ানে জ্ঞান তাপান রাজ্জাক স্যারের জ্ঞানের প্রগাঢ়তা লক্ষ্য করা যায়। স্যার পিএইচডি জন্য বিলেতে গিয়েছিলেন এবং সর্বমোট সাড়ে পাঁচ বছর হ্যারন্ড লাস্কির ছাত্র হিসাবে সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু লাস্কি আকর্ষিক মৃত্যুর কারণে পিএইচডি শেষ না করেই দেশে ফিরে আসেন। মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় তার বড় ভুমিকা ছিলো। মুসলমান সমাজের অগ্রগতির জন্য যে বুদ্ধি মুক্তি আন্দোলনের জন্য মোতাহের হোসেন চৌধুরী পরিচিত। সে আন্দোলনে প্রফেসর রাজ্জাক স্যারের আবদান কারও সাথে তুলনা হতে পারে না। আন্দোলনটা সাবালক করার পিছনের অনেক শ্রম তাকে দিতে হয়েছিলো। 




ছফা গুরুকে নিয়ে একটি লাইন দিয়ে শুরু করেন।

“যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি বাড়ি যায়

তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়” 

উনিশশো সত্তোর সালের দিকে বাংলা একাডেমির তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের সুযোগ পেলে একজন থিসিস সুপারভাইজার প্রয়োজন পরে আহমদ রাজ্জাক স্যারের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি প্রথমে রাজি হননি। কেননা প্রফেসর রাজ্জাক স্যার অত্যান্ত নাকউঁচু স্বভাবের মানুষ ছিলেন। পরে ঘটনাচক্রে তিনি রাজি হন এবং তারপর থেকে নিয়মিত রাজ্জাক স্যারের বাসায় যাতায়াত করেন। গুরু রাজ্জাক স্যার সব সময় ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলতেন এবং তার মুখে ঢাকাইয়া ভাষায়  কথা শুনলে মনে হত এটাই ভদ্রলোকের ভাষা। তার চলাফেরা ছিলো একদম সাদামাটা, পোশাকের চাকচিক্য ছিলো না। তিনি কখনো মঞ্চে বক্তব্য রাখতেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহ দেখাতেন না। কিন্তু রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন প্রভৃতি বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়েছেন বহু শিক্ষার্থী। যেমনটা তুলনা করা যেতে পারে সক্রেটিসের সাথে, কি অঘোমমন্ত্র বাণে তরুণের দল ছুটে যেত তার কাছে।

স্যারের নিকট সবাইকে যে বুদ্ধিবৃত্তিক তৃষ্ণার টানে আসতেন বিষয়টা তেমনও না। সমাজে তার বৃহৎ গ্রহণ যোগ্যতা থাকায় অনেক মতলববাজ ঘেসতো। তেমন একটি ঘটানা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর পদপ্রার্থী ছিলেন আব্দুল মতিন চৌধুরী। তিনি বিলেত  থেকে পিএইচডি করে এসে একটি থিসিসের কপি স্যারের রুমে রেখে যান। ফোনে জানালে মতিন চৌধুরী বলেন দয়া করে সিলেকশন কমিটিকে বলবেন কাজটা দারুণ হয়েছে। অনেকে তার দয়া দক্ষিনা নিয়ে পরে ভুলে গিয়ে বিরুদ্ধে বকেছে। কিন্তু তিনি তাতে কর্ণপাত করেনি। 

 আহমদ ছফাকে থিসিস লেখার জন্য প্রায় প্রতিনিয়ত তার কাছে যেত হত এবং আলাপচারিতা অনেক কিছু উঠে আসতো। ভিন্ন সময়ে ভিন্ন বিষয়ে কথা হতো এবং স্যার নিজের অভিজ্ঞতা বলতেন। তার মতে কোন এলাকায় সম্পর্কে জানতে আগে সেই এলাকার কাঁচা বাজার এবং বইয়ের দোকানে গেলে বুঝতে পারা যায় সমাজটা কোন দিকে যাচ্ছে। পল্লীকবি জসীমউদ্দিন তার কাছের মানুষ ছিলেন। জসীমউদ্দিনের আত্মজীবনী “জীবন কথা'র” প্রসংশা করেছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুলের কথায় আসলে তিনি শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠতেন এবং বলতেন বজ্র, বিদ্যুৎ আর ফুল এই তিনে নজরুল। রাজ্জাক স্যারের রুমে মোটা মোটা মলাটের বিভিন্ন প্রজাতির বই থাকতো। রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান, ইতিহাস, রাষ্ট্রতত্ত্ব ছাড়াও, বালজাকের রচনাবলী, ফ্লবেয়ারের উপন্যাস, মোপাসাঁর রচনা, ভিকটর হুগোর বই ইত্যাদি। যেনতেন ব্যক্তির পক্ষে এসব বইয়ে দাঁত বসাবার অনেকটা কঠিন। ছফা রাজ্জাক স্যারের সাথে  দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অনেকটা ভারি কথা বলেছেন।



 ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কেন বলা হয় তার হেতু অজানা। শুধুমাত্র দালানকোঠার ভৌত অবকাঠামোগত কারণে অক্সফোর্ডের সাথে তুলা চলে না। বেঙ্গলের শিক্ষা ব্যবস্থা এক সময় টপ হেভি ছিলো। দুর্ভাগ্য যে এখানে সাপোর্টিং কোন কলেজ তৈরি করার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে। আবার সাপোর্টিং স্কুল ছাড়াই কলেজ তৈরি হইছে। এই জন্য বিশ্বের সাথে শিক্ষায় বিরাট ফাঁক এবং অন্তরা শূন্য। বাঙালিদের শুধু ডিগ্রি পাবার ক্রেজ, এটা কলেজ তৈরি হবার আগে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হবার ফল। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন গ্রেট বিট্রেনের বাজেটে ডিফেন্সের চাইতে এডুকেশন সেক্টরে বেশি অর্থ বরাদ্দ থাকে। শিশুদের বাধ্যতামূলক দুধ ডিম খাইতে হয়। এই জন্য বিট্রিশ শিশুদের চেহারা অন্যদের থেকে আলাদা। রাজ্জাক স্যার চিন্তিত ছিলেন, শিক্ষকরা প্রতিবছর বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন, নতুন প্রজন্মের জন্য চাহিদা, চাওয়া পাওয়ার খবর বৃদ্ধদের জনার কথা না। অথচ দক্ষ শিক্ষক তৈরি হচ্ছে না। এটাই বড় ট্র্যাজেডি। তিনি আরবি, ফারসি এবং সংস্কৃত জানা মানুষদের গুরুত্ব বুঝতেন এবং তাদের সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে উৎদ্বিগ্ন ছিলেন। কেননা, তারা কমে গেলে ঐসব ভাষা থেকে ওরিজিন্যাল সোর্স করার ক্ষমতা থাকবে না। তখন সেকেন্ড হ্যান্ড সোর্স পর্যালোচনা করা লাগে তখন বিস্তর অপূর্ণতা থাকে। এই গুরুত্ব বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে আহমদ ছফা প্রার্থী ছিলেন। সরাবত কারণে ছফাকে সুপারিশ করার কথা থাকলেও একজন ফার্সিতে দক্ষ প্রার্থীকে সুপারিশ করেন এবং তাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।



আজকের আধুনিক বাংলা ভাষা নিয়ে আব্দুল রাজ্জাক স্যার বেশ চমকপ্রদ  কথা বলেন। আজকের আধুনিক  বাংলা ভাষাটা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা সংস্কৃত অভিধান দেখে তৈরি করছেন। আরবি এবং ফার্স ভাষার শব্দ মিলের শক্তিশালী একটি স্ট্রাকচার ছিলো। পলাশী যুদ্ধের সময় কবি ভারতচন্দ্রের রচনায় তার অনেক নমুনা পাওয়া যায়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতের আবরি এবং ফারসি শব্দ বাদ দিয়ে সংষ্কৃতি শব্দ যুক্ত করে আসল বাংলা ভাষাটাই বিকৃতি করে ফেলে। এর বাস্তবিকরুপ দেয় বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথ। 



কালের বিবর্তনে দেশের মানুষের স্বাস্থ্যহানী ঘটেছে সে কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা যখন ছোট ছিলাম গ্রামে উঁচা-লম্বা এক ধরনের শালপ্রাংশু চেহারার মানুষ দেখা যেত। এখন পাঁচ গ্রাম খুঁজলেও পাওয়া যায় না। পুষ্টিকর খাবারের দুষ্প্রাপ্যতাই মানুষের স্বাস্থ্যহানির আসল কারণ। আগে গ্রামে অঢেল খাদ্যদ্রব্য পাওয়া যেত, নদীবিলে হাত দিলে মাছ পাওয়া যেত। এখন আর নেই। তিনি আমাদের জনপদের সাথে পশ্চিমের রান্না প্রকৃয়ার তুলনা করে বলেন, আমাদের রান্না সঙ্গে পশ্চিমাদের তুলনা চলে না। যে জাতি যত বেশি সিভিলাইজড তার রান্নাও তত বেশি সফিস্টিকেটেড। পশ্চিমারা কিছু কাল আগেও কাঁচা মাছ মাংস খাইত। হিন্দু ধর্ম, ইসলাম এবং খ্রিস্টান ধর্মের নিয়ে বলতে গিয়ে হিন্দু ধর্মের জন্মান্তরবাদ বিশ্বাস নিয়ে বলেন, প্রাচীন আর্যদের সময়ে এটা ছিলো না। আর্যরা বিশ্বাস করলে বেদে লিখে যাইতেন। বেদে জন্মান্তরবাদের ছিটেফোঁটাও নেই। খ্রিস্টান ধর্মে রেনেসাঁর আগে সব কিছু হতো পরকাল নির্ভর। রেনেসাঁর পরে দুনিয়াটাই সব, পরকাল কিছুই না। ইসলাম ধর্মে পরকাল গুরুত্ব দেওয়ার সাথে দুনিয়ায়কে অস্বীকার করা হয় নাই। এটাই ইসলাম ধর্মের সাথে বাকি ধর্মের তফাত।  



এর পর দেশের কবি সাহিত্যিকদের কাজে হাত দেন এবং বলেন - বাংলা গদ্যের বিকাশ নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন নাইন্টিন সেঞ্চুরি আধুনিক বাংলা গদ্যের জন্য সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় বাংলা গদ্যের  বিকাশে অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে বলতে শুরু করেন।রামমোহন বিলাত পাঠানোর সময় রাজা টাইটেল দিলেন বাহাদুর শাহ অথচ বাহাদুর শাহর তখন রাজত্ব ছিলো না। কিন্তু রামমোহনের যোগ্যতা ছিলো অঢেল। আরবী, উর্দু, ফারসি, সংস্কৃতি ইংরেজি সব বিষয়ে তার অগাধ জ্ঞান থাকলেও তেমন কাজে লাগানি। একমাত্র বড় কাজ গৌড়ীয় বাংলা ব্যাকরণ। তার থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদার ঢের বেশি। মধ্যযুগের সাহিত্য মনসামঙ্গলের চাঁদ সওদাগরের কাহিনির অনেক প্রশংসা করে বলেছেন বাংলা সাহিত্যে চাঁদ সওদাগরের মতো শক্তিশালী চরিত্র একেবারে বিরল। সমুদ্র –বাণিজ্য শক্তির প্রতীক।  মাইকেলের মেঘনাদকেও চাঁদ সওদাগরের পাশে ম্লান দেখায়। 



এর পরপরই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমানের বিবাদে কবি সাহিত্যিকের ঘি প্রয়োগে কুৎসিত  অবদান আছে তা উল্লেখ করেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাম্প্রদায়িক লেখা লিখতেন, বঙ্কিমচন্দ্র মুহসিন ফান্ডের টাকা দিয়ে পড়াশোনা করে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে লিখে তার ঋণ শোধ করেছেন। রাজ্জাক স্যার আরও বলেন, বাংলা সাহিত্যের সব উপন্যাস এক জায়গায় করলে দেখা যাবে প্রায় সব চরিত্র রাম,শ্যাম, যদু, মধু । বেঙ্গলে মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি।   তারা উপন্যাস থেকে মুসলমানদের ডেলিবারেটলি ইগনোর করে গেছে। রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে আসলে বলেন, রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ঠিকই ছিলো কিন্তু বড় লেখক আর বড় মানুষ এক জিনিস না। তিনি বড় লেখক কিন্তু বড় মানুষ না। লেখক কবিরা যা বলে সেরকম আচরণ করে না জন্য প্লেটো রিপাবলিক থেকে কবিদের নির্বসনে পাঠানোর কথা বলেছিলো। কবিরা বাংলায় লিখেন কারণ চাষাভুষা, মুটেমজুর কথা বলে বাংলায়। তিনি সমর সেনের অনেক তারিফ করছিলেন এবং আত্মজৈবনিক রচনা বাবু বিতান্ত কথা বলতেন। যে বয়সে সমর সেন এ জাতীয় লিখা লিখছেন তার সাথে রবীন্দ্রনাথের তুলনা করলে তুলানা চলে না।  



তৎকালীন সময়ে সালমান রুশদির লেখা মিডনাইট চিলড্রেনস বাজারে আসে এবং রাজ্জাক স্যার এক কপি সংগ্রহ করে এবং তারিফ করেন। সালমান রুশদির লেখা নিয়ে যেমন উচ্ছ্বসিত হতেন, তেমন কারও লেখায় হতেন না। এক পর্যায়ে ১৯৪০ সালের দাঙ্গার কথা উঠে। তার পরে দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেন, অন্নদাশঙ্কর রায় প্রমুখ ব্যক্তি দাবি করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম পুলিশ দিয়ে দাঙ্গা সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই সময়ে পুলিশের চার ভাগের তিন ভাগ পুলিশ ছিলো হিন্দু। তাহলে কিভাবে পুলিশ দ্বারা দাঙ্গা সৃষ্টি করা যায় স্যার সেই যুক্তি তুলে ধরেন। বাংলাদেশের  স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি নিকসন প্রশাসনকে প্রভাবিত করে বিরোধিতা করেছিলো এবং তলাবিহীন ঝুড়ি বলা লোক হেনরি কিসিঞ্জার সঙ্গে পরিচয় নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, কিসিঞ্জার সুবিধার মানুষ ছিলেন না। তবে তার সাথে সম্পর্ক ভালো ছিলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রাজকীয় সংবর্ধনা আয়োজন করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে কিসিঞ্জারকে বরন করেছিলো। যে সোভিয়েত যুদ্ধে সাহায্য করেছিলো তাদের সাথে সম্পর্কে ছেদ করে শেখ মুজিব, যা কষ্টদায়ক। 



আহমদ ছফার সাথে গুরু আব্দুল রাজ্জাক স্যারের সম্পর্ক তৈরি হয় তা ছাত্র শিক্ষকের থেকে বেশি কিছু । মাতৃস্তনে যেমন শিশুর অধিকার থাকে তেমনি রাজ্জাক স্যার উপর ছফার অধিকার ছিলো। ছফা সময়ে -অসময়ে স্যারের নিকট টাকা নিতেন এবং স্যার তা হাসি মুখে পূরণ করতেন। একবার স্যার কলকাতায় ঘুরতে গিয়ে ছফার জন্য একটি চাদর এবং কিছু বই উপহার হিসাবে নিয়ে আসেন। চাঁদরটা গায়ে পরিয়ে দেওয়া সময় একজন ভদ্রলোক ঘরে ঢোকার উপক্রম হলে গা থেকে টান দিয়ে নিয়ে লুকিয়ে ফেলেন,এতে ছফা ভীষণ বিব্রত হন। ভদ্রলোক চলে গেলে স্যার বলেন কিছু জিনিস অন্য কারও সামনে দিতে নেই। স্যার সব সময় চাইতেন ছফা বড় কোন লেখায় হাত দিক। তারই ফলশ্রুতিতে মহাকবি গ্যোতের ফাউস্ট অনুবাদ করেন। এ কাজের জন্য ছফার প্রতি স্যার ভীষণ খুশি হন এবং স্যারের সাথে প্রতিনিয়ত হোমড়াচোমরা যে লোকগুলা দেখা করতে আসতেন সবাইকে এ মহৎ কাজের কথা মহা উৎসাহে  বলতেন। তেমনি একজন অর্থনীতিবিদ ড. মুশাররফ  কে বললে বড় বড় করে চোখ পাকিয়ে ভদ্রলোক  ই-ন্টা-রে-স্টি-ং শব্দ এমনভাবে  উচ্চারণ করেন এতে ছফার পিত্তি জ্বলে উঠে। বিলাত ফেরত ভদ্রলোকের নাসিক্যধ্বনি শুনে অনেকটা অপমানিত হন। তখন ছফা ড. মুশাররফ কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি গ্যোটের কোন বই পড়েছেন বা নাম শুনেছেন?  ভদ্রলোক আমতা আমতা করে বলেন, হ্যাঁ শুনে থাকবো। আবার ছফা আবার জিজ্ঞেস করেন, আর কিছু জানেন?  উত্তরে বলেন, না। ভদ্রলোক হকচকিয়ে যান। উক্ত ঘটনার ফলশ্রুতিতে ছফা বলেন, ❝প্রতিষ্ঠাসম্পুন্ন কাউকে সালাম দিলে, সালামটা তার প্রাপ্য বলে ধরে নেন এবং যিনি সালাম দেন তাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছোটলোক বলে ধরে নেন❞। 


জ্ঞান তাপস রাজ্জাক স্যার এবং আহমদ ছফার দেখা হওয়াটা একে অপরের জন্য অনেকখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। প্রফেসর রাজ্জাক স্যার পেয়েছিলেন একজন জ্ঞান পিপাসু পাগলা ঘোড়া এবং ছফা পেয়েছিলে জ্ঞান সাগর সমতুল্য শিক্ষা গুরু । 

শেষে ছফা বলেন, ❝ইংরেজ কবি শেকসপিয়ার জীবনটা কাটিয়েছিলেন লন্ডনে তবু অ্যাবন নদীর পাড়ের ছেলে বলা হত।  জর্মান কবি গ্যোতে তিরিশের কোঠায় পা রাখার পর ফ্রাঙ্কফুর্ট ছেড়ে ভাইমারে চলে গিয়েছিলেন। দীর্ঘ বিরাশি বছর বেঁচে থাকলেও থাকে ফ্রাঙ্কফুর্টের ছেলে বলা হতো। ঠিক সেভাবে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক স্যারের পরিচয় জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর হবে ছাচ্ছা ঢাকার পোলা❞। 


লেখক: শামীম আহমেদ 

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ।


নিউজটি পোস্ট করেছেনঃ Bangladesh Shomachar

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
notebook

নতুন একনেক গঠন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভাপতি