>> মো. ছাব্বির হোসাইন
আমাদের সমাজে পাখি পালন অনেকেরই প্রিয় শখ। ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে কিংবা নিঃসঙ্গ সময়ের সঙ্গী হিসেবে অনেকেই খাঁচায় পাখি পালন করেন। ছোট-বড় সবার কাছেই খাঁচার রঙিন পাখির দৃশ্য খুবই আনন্দদায়ক। কিন্তু পাখি পালন নিয়ে মানুষের প্রশ্নগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, "ইসলামে খাঁচায় পাখি পোষা কি বৈধ (জায়েজ)? না-কি এটি নিষিদ্ধ (হারাম) ও গুনাহের কাজ?" নিচে এটা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো-
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাণীর প্রতি দয়া:
ইসলাম এমন এক ধর্ম, যেখানে প্রতিটি জীবের প্রতি করুণা প্রদর্শনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রাণীর ওপর অযথা কষ্ট দেওয়া ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। তবে যে পাখিগুলো খাঁচায় জন্ম নেয় ও সেখানেই বড় হয়, অর্থাৎ প্রকৃতি থেকে ধরে আনা নয়, সেসব পাখিকে যথাযথ খাবার, পানি ও যত্নের মাধ্যমে লালন-পালন করা ইসলামে বৈধ (জায়েজ)। ফিকহের গ্রন্থগুলোতে বলা হয়েছে, যদি খাবার-পানির সঠিক ব্যবস্থা থাকে এবং পাখি কষ্ট না পায়, তাহলে খাঁচায় পোষা জায়েজ। (আপকে মাসায়েল আওর উনকা হল: ৪/৪৫৪; ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত: ১১/১৭৩)
পাখি পালন নিয়ে কুরআন কী বলে?
আল্লাহ তায়ালা বলেন “পৃথিবীতে যত জীব আছে কিংবা যেসব পাখি দু’ডানা মেলে উড়ে, তারা সবাই তোমাদের মতোই সম্প্রদায়।”(সূরা আন‘আম ৬:৩৮) এই আয়াত স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, পাখির নিজস্ব জীবন, অনুভূতি ও দায়িত্ব রয়েছে। অতএব, তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। কুরআনে পাখিদের শুধু সৃষ্টির সৌন্দর্য হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান ও বার্তার বাহক হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে। সূরা নামল-এ আল্লাহ বলেন, “সুলায়মান (আ.) হুদহুদ পাখির কাছ থেকে খবর পেলেন এক জাতির, যারা সূর্য পূজা করত।” (সূরা নামল ২৭:২০–২৮) তাফসিরের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, হজরত সুলাইমান (আ.) ছিলেন আল্লাহপ্রদত্ত নবী, যাঁর সেনাবাহিনীতে মানুষ, জিন ও পাখি সবাই অন্তর্ভুক্ত ছিল। একদিন তিনি পাখিদের পরিদর্শন করলেন এবং দেখলেন, তাঁর সেনাদলে হুদহুদ (হুপো পাখি) অনুপস্থিত। নবী সুলাইমান (আ.) তাঁর দায়িত্বহীনতার জন্য কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিলেন। কিছুক্ষণ পর হুদহুদ ফিরে এসে জানাল, সে সাবা রাজ্যের রানী বিলকিস সম্পর্কে সংবাদ এনেছে, যিনি সূর্য পূজা করতেন। এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, হজরত সুলাইমান (আ.)-এর সাথে পাখিদের একটি সখ্যতা ছিল।
পাখি পালন নিয়ে হাদিস কী বলে?
সাহাবায়ে কেরামদের যুগ থেকেও পাখি পালনের প্রমাণ পাওয়া যায়। হিশাম ইবনে উরওয়া (রা.) বলেন, “আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা.) মক্কায় ছিলেন; তখন নবী করিম (সা.)-এর সাহাবিরা খাঁচায় পাখি রাখতেন।” (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৩৮৩)
এছাড়া আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, “আমার এক ভাই ছিল, নাম ছিল আবু উমায়ের। সে ‘নুগায়ের’ নামের একটি পাখির সঙ্গে খেলত। নবী করিম (সা.) যখন তাকে দেখতেন, বলতেন, "হে আবু উমায়ের! কী করছে তোমার নুগায়ের?”(বুখারি: ৬১২৯; মুসলিম: ২১৫০) এই হাদিসগুলো প্রমাণ করে, পাখি পালন করা ও যত্ন নেওয়া সাহাবিদের আমলেও প্রচলিত ছিল, এবং নবী করিম (সা.) তা নিষিদ্ধ করেননি।
পাখি পালনের শর্ত ও সীমারেখা:
খাঁচায় পাখি পালনের অনুমতি থাকলেও কিছু শর্ত মানা আবশ্যক। নিম্নে দেওয়া হলো-
১. খাবার, পানি ও বাতাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে।
২. পাখির কষ্ট বা যন্ত্রণার কারণ হওয়া যাবে না।
৩. অসুস্থ হলে চিকিৎসা ও যত্ন নিশ্চিত করতে হবে।
৪. যদি দেখা যায় খাঁচায় কষ্ট হচ্ছে, তবে তাকে মুক্ত করে দিতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “এক নারীকে জাহান্নামে দণ্ডিত করা হয়েছে, কারণ সে একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল; না খাবার দিয়েছিল, না ছেড়েছিল যাতে সে খেতে পারে।” (বুখারি: ২৩৬৫; মুসলিম: ২২৪২) অতএব, যত্ন ছাড়া কোনো প্রাণীকে বন্দি রাখা গুনাহ ও নিষিদ্ধ।
স্বাধীন পাখিদের বিষয়ে করণীয়:
প্রকৃতিতে স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়ানো পাখিদের ধরে এনে খাঁচায় বন্দি করা ইসলামী দৃষ্টিতে অনুচিত। এতে তাদের প্রাকৃতিক স্বাধীনতা ও জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হয়, এবং প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই এমন পাখিদের খাঁচায় না রেখে উড়তে দেওয়া উত্তম ও সওয়াবের কাজ।
যেসব পাখি খাঁচায় জন্ম নেয় এবং যথাযথ যত্ন ও খাবার-পানির ব্যবস্থা থাকে, তাদের খাঁচায় পোষা ইসলামে বৈধ (জায়েজ)। কিন্তু যত্নহীনতা বা কষ্ট দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হলে, তা অন্যায় ও গুনাহের কাজ। ইসলাম মানবিকতা ও দয়ার ধর্ম। প্রতিটি প্রাণীর জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ রাখাই একজন প্রকৃত মুসলমানের বৈশিষ্ট্য।
কলামিস্ট'র পরামর্শ:
শখের পাখি পালন যেন শুধু বিনোদনের উপকরণ না হয়ে, প্রাণের প্রতি মমতা ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন হয়, সেটাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
