বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি কেন্দ্রীয় অধ্যায়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই ধারাবাহিকতারই গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আবারও একই পুরোনো প্রশ্ন সামনে এসেছে, ভোটার সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু হবে কি দলীয় মার্কা, না-কি প্রার্থী? স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের নির্বাচনগুলোতে দলীয় প্রতীক ও আবেগের ভূমিকা প্রবল হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোটারের প্রত্যাশা বদলেছে। উন্নয়ন, সুশাসন ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে আজকের ভোটার অনেক বেশি সচেতন। ফলে 'মার্কা না প্রার্থী', এই দ্বন্দ্বটি কেবল তাত্ত্বিক নয়; এটি গণতন্ত্রের গুণগত মান নির্ধারণের প্রশ্ন।
মার্কার শক্তি; পরিচিতি, আদর্শ ও সংগঠন:
দলীয় মার্কা ভোটারকে তিনটি সুবিধা দেয়। প্রথমত, পরিচিতি। একটি প্রতীক দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শের বহনকারী। দ্বিতীয়ত, সংগঠন। দলীয় কাঠামো নির্বাচিত প্রতিনিধিকে সংসদে ও মাঠে কাজের সক্ষমতা দেয়। তৃতীয়ত, নীতির ধারাবাহিকতা। দল ক্ষমতায় গেলে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।
কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন মার্কা ব্যক্তির জবাবদিহিতাকে ঢেকে ফেলে। দলীয় পরিচয়ের আড়ালে অযোগ্যতা, দুর্নীতি বা জনবিচ্ছিন্নতা যদি প্রশ্রয় পায়, তবে গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
প্রার্থীর গুরুত্ব; চরিত্র, দক্ষতা ও জনসংযোগ:
একজন প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, শিক্ষা, সততা, প্রশাসনিক ধারণা, সংসদীয় কার্যপ্রণালি বোঝার সক্ষমতা, এসব সরাসরি এলাকার উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। নির্বাচিত সদস্যের কাজ কেবল দলীয় লাইনে ভোট দেওয়া নয়; আইন প্রণয়নে অংশগ্রহণ, বাজেট আলোচনায় এলাকার দাবি তুলে ধরা এবং সরকারের ওপর নজরদারি করাও তার দায়িত্ব। যে প্রার্থী এলাকায় নিয়মিত উপস্থিত, জনসমস্যায় দ্রুত সাড়া দেয়, স্বচ্ছভাবে তহবিল ব্যবস্থাপনা করে এবং সংসদে সক্রিয়, সে দলীয় মার্কা যাই হোক না কেন, ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত।
ভোটারের জন্য সিদ্ধান্তের মানদণ্ড:
ভোটার যদি সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে চান, তবে কয়েকটি বিষয় জানা জরুরি।
১. প্রার্থী কী অতীতে জবাবদিহি করেছেন? (সম্পদ বিবরণী, স্বচ্ছতা, অভিযোগের ইতিহাস)
২. সংসদীয় সক্ষমতা। (আইন বোঝা, বক্তব্য, উপস্থিতি, দলীয় কাজ)
৩. এলাকার প্রতি দায়বদ্ধতা। (নির্বাচিত হলে তিনি সংসদে ও এলাকায় কী ভূমিকা রেখেছেন বা রাখার পরিকল্পনা করছেন।)
৪. দলীয় ইশতেহার কতটা বাস্তবসম্মত এবং প্রার্থী তা বাস্তবায়নে কতটা প্রতিশ্রুত।
৫. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে অঙ্গীকার। (মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নে অবস্থান।)
৬. প্রার্থীর ব্যক্তিগত রেকর্ড। (শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা, দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি।)
৭. দলীয় নীতি ও আদর্শ। (দলটি রাষ্ট্র পরিচালনায় কী ধরনের নীতি অনুসরণ করে এবং তা নাগরিক স্বার্থের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।)
উন্নয়ন বনাম সুশাসন:
উন্নয়ন দৃশ্যমান, রাস্তা, সেতু, অবকাঠামো। কিন্তু সুশাসন অদৃশ্য, স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা। কেবল অবকাঠামো দেখেই ভোট দিলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হয়; আবার কেবল নৈতিকতার কথা বলেও উন্নয়ন উপেক্ষা করা যায় না। ভোটারের কাজ হলো এই দুয়ের ভারসাম্য খোঁজা। দল উন্নয়নের রূপরেখা দেবে, প্রার্থী নিশ্চিত করবে সুশাসনের বাস্তবায়ন।
তরুণ ভোটার ও নতুন প্রত্যাশা:
তরুণ ভোটারদের কাছে কর্মসংস্থান, শিক্ষা-দক্ষতা, ডিজিটাল সেবা ও পরিবেশ, এসব অগ্রাধিকার পাচ্ছে। তারা চায় প্রতীক নয়, ফলাফল। এই প্রজন্ম প্রশ্ন করে, তথ্য যাচাই করে এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিধির কাজের হিসাব চায়। এই চাপই রাজনীতিকে ধীরে ধীরে ব্যক্তিনির্ভর জবাবদিহিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতা বদলের ইভেন্ট নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশনা। মার্কা ও প্রার্থী, দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে অন্ধ আনুগত্য নয়, সচেতন বিচারই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। আদর্শ ও সংগঠনের জন্য দলীয় মার্কা দরকার; কিন্তু সেই মার্কাকে অর্থবহ করে তোলেন যোগ্য, সৎ ও পরিশ্রমী প্রার্থী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারের সিদ্ধান্ত যদি এই ভারসাম্য রক্ষা করে, তবে সেটিই হবে সচেতন নাগরিকের গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার উত্তম দায়িত্ব।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।
ই-মেইল: mdsabbirjurnalist@gmail.com
