মোঃ চপল সরদার
বাংলাদেশ পুলিশের মাঠপর্যায়ের মেরুদণ্ড বলা হয় সাব-ইন্সপেক্টরদের (এসআই)। কিন্তু এই কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার এখন যেন এক অন্ধকার কানাগলি। নিয়োগ কাঠামোয় বিদ্যমান পাহাড়সম বৈষম্য আর দীর্ঘদিনের স্থবিরতায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। ২৫ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন পার করেও অনেকের ভাগ্যে জুটছে না দ্বিতীয় পদোন্নতি। এই পরিস্থিতির কারণে মেধাবী তরুণরা এখন পুলিশে যোগ দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
একই সময় যোগ দিয়ে কেউ ডিআইজি, কেউ পরিদর্শক
পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি) অনুযায়ী, পুলিশে নিয়োগ হয় তিন স্তরে—কনস্টেবল, সরাসরি এসআই এবং বিসিএস ক্যাডার (এএসপি)। তবে এই তিন স্তরের ক্যারিয়ার গ্রাফ বিশ্লেষণে দেখা যায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান।
পরিসংখ্যান বলছে, একই সময়ে চাকরিতে যোগ দিয়ে ২৫ বছরে একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা ৪ থেকে ৫টি পদোন্নতি পেয়ে ডিআইজি বা অতিরিক্ত আইজি হন। এমনকি একজন কনস্টেবলও বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে ৫টি পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক বা এএসপি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন। অথচ সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত এসআইদের সিংহভাগই ২৫ বছর পর মাত্র একটি পদোন্নতি পেয়ে পরিদর্শক হিসেবেই অবসরে যাচ্ছেন।
একই মেধা ও যোগ্যতা নিয়ে এসেও কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে আমরা সারাজীবন মাঠেই পড়ে থাকছি। আমাদের সহপাঠীরা ক্যাডার সার্ভিসে এসে নীতিনির্ধারক হচ্ছেন, আর আমরা একটি পদোন্নতি পেতেই অর্ধেক জীবন পার করে দিচ্ছি। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন একজন ভুক্তভোগী এসআই।
পিএএল ভুক্তদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা: মন্ত্রণালয় ও সদরদপ্তরের গাফিলতিঃ
মাঠপর্যায়ের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে এখন বড় ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রমোশন অ্যাপটিটিউড লিস্ট (পিএএল)। অভিযোগ উঠেছে, যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে পিএএল ভুক্ত সাব-ইন্সপেক্টরদের পদোন্নতি ঝুলে আছে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতিকে এর জন্য দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তকারী এই কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করায় মাঠপর্যায়ে কাজের স্পৃহা কমছে, যা পুরো বাহিনীর মেরুদণ্ডকে দুর্বল করে দিচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
পদোন্নতির কচ্ছপ গতি ও মানসিক যন্ত্রণাঃ
একজন এসআই ১১-১২ বছরে একটি পদোন্নতি পেলেও একই সময়ে একজন কনস্টেবল পান দুটি এবং এএসপিরা পদোন্নতি পেয়ে এসপি হয়ে যান। সরকারি অন্যান্য বিভাগে পদোন্নতি ও গ্রেড সমন্বয়ের সুযোগ থাকলেও পুলিশের সরাসরি এসআইদের ক্ষেত্রে তা উপেক্ষিত। প্রায় ৯০ শতাংশ পুলিশ পরিদর্শক একই পদে থেকে অবসরে যান। ফলে পরিবার ও সামাজিকভাবে তারা চরম হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন, যা তাদের পেশাদারিত্বে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সুপার নিউমারারি’র বৈষম্য ও মেধাবীদের মোহভঙ্গঃ
ঊর্ধ্বতন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময় সুপার নিউমারারি (সংখ্যাতিরিক্ত পদ) তৈরি করা হলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য কোনো কার্যকর কাঠামো তৈরি হয়নি। দীর্ঘ ১৭-১৮ বছর নবম গ্রেডে চাকরি করার পর যখন একজন পরিদর্শক এএসপি হওয়ার সুযোগ পান, ততদিনে তার চাকরির বয়স শেষ পর্যায়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জানান, আগে এসআই পদে অনেক মেধাবী আসতেন। কিন্তু বর্তমান অনিশ্চয়তা দেখে কেউ এই পেশায় আসতে চাইছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই স্থবিরতা বজায় থাকলে বাহিনীতে পেশাগত শৈথিল্য ও দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়বে।
সংকট উত্তরণে ৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব
পুলিশের এই অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনে বিশেষজ্ঞরা নিচের সমাধানগুলো জরুরি বলে মনে করছেন:
স্বয়ংক্রিয় উচ্চতর গ্রেড: বিসিএস ক্যাডারদের মতো সাব-ইন্সপেক্টরদের জন্যও নির্দিষ্ট সময় পর (৮ বা ১০ বছর) টাইম স্কেল বা উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা।
মাঠপর্যায়ে সুপার নিউমারারি পদ: পরিদর্শকদের জন্য এএসপি বা অতিরিক্ত এসপি পদে পর্যাপ্ত সংখ্যাতিরিক্ত পদ সৃষ্টি করা।
নতুন পদমর্যাদা সৃষ্টি: এসআই এবং ইন্সপেক্টর পদের মাঝে সিনিয়র সাব-ইন্সপেক্টর বা চীফ ইন্সপেক্টর এর মতো নতুন স্তর তৈরি করা।
পিএএল জট নিরসন: পিএএল ভুক্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে মন্ত্রণালয় ও সদরদপ্তরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা।
নিয়োগ কাঠামোর আমূল সংস্কার: ৩ স্তরের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ২ স্তরে নামিয়ে আনা, যাতে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞরা দ্রুত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পুলিশের এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বৈষম্য ও পদোন্নতির জট দ্রুত নিরসন করা না গেলে বাহিনীর চেইন অব কমান্ড এবং জনসেবার মান ভেঙে পড়তে পারে।
