মোঃ মামুন:
১৭ই জানুয়ারী ২০২৬ ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে মীরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরী ইনস্টিটিউট এর প্রাথমিক শাখার সঙ্গীত বিভাগের বরখাস্ত হওয়া সহকারী শিক্ষক বিপাশা ইয়াসমিন এর অনিয়ম, শৃঙ্খলা ভঙ্গ, সহিংস কর্মকান্ড ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের প্রতিবাদে প্রধান শিক্ষক জিনাত ফারহানা এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন জেসমিন আহমেদ, ইনচার্জ দিবা শাখা, সোহারা সুলতানা, ইনচার্জ প্রভাতী শাখা, আহমেদ উল্লাহ কাসেম, সহকারী প্রধান শিক্ষক, মোঃ ইসরাফীল, অভিভাবক প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন প্রধান শিক্ষক জিনাত ফারহানা। তিনি বলেন, আমি মীরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরী ইনস্টিটিউট-এর পক্ষ থেকে আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি বরখাস্তকৃত সহকারী শিক্ষক (সংগীত) জনাবা বিপাশা ইয়াসমিনের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, শৃঙ্খলাভঙ্গ, সহিংস আচরণ, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব খাটানোর ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরার জন্য। দীর্ঘদিন ধরেই বিপাশা ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে নানাবিধ অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও অপকর্মের অভিযোগ উঠে আসছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এসব কর্মকাণ্ড নতুন মাত্রা পাওয়ায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট করার প্রয়োজন অনুভব করেছে। সূত্র অনুযায়ী, ২০১৫ সালে জনাবা বিপাশা ইয়াসমিনকে সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে এবং অনুমোদিত শিক্ষক-কর্মচারী প্যাটার্নের বাইরে নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে—ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজন একই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নজরুল ইসলাম এর স্ত্রী পরিচয় ব্যবহার করে এবং প্রভাবশালী ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহর রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবে এই নিয়োগ কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের সরাসরি হস্তক্ষেপে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে তার চাকরি স্থায়ী করা হয়। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অমান্য, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, দেরিতে উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে কর্তৃপক্ষকে চাপে রাখার প্রবণতা তার নিত্যদিনের আচরণে পরিণত হয়। তিনি আরো বলেন, এক পর্যায়ে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মিথ্যা যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন। প্রকৃত ঘটনা হলো—নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ক্লাসে যাওয়ার বিষয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক তাকে প্রশ্ন করেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ না করার জন্য সতর্ক করেন। উল্লেখ্য, ক্লাসে দেরিতে যাওয়া তার নিত্য অভ্যাস ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন এবং দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় এই ন্যাক্কারজনক ও ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রকাশ করান। এই অভিযোগের বিষয়ে তিনটি তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়—১) অভ্যন্তরীণ তদন্ত, ২) মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের তদন্ত, ৩) মহিলা পরিষদের নির্দেশনায় ডিএমপি ঢাকা উত্তর-এর তদন্ত। তিনটি তদন্তেই তার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এরপরও তিনি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মানুষের কাছে প্রচার করে যাচ্ছেন যে, তাকে যৌন হয়রানি করা হয়েছে। কর্মরত অবস্থায় তিনি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কোমলমতি শিশুদের কাছেও এসব কথা বলে বেড়াতেন, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। শুধু তাই নয় তারপক্ষে না থাকলে শিক্ষার্থীদের দিয়ে যৌন নির্যাতনের মামলা করাবে বলে হুমকি দিতে থাকে ফলে ১৪জন পূরুষ শিক্ষক মিরপুর থানায় জি ডি করে । রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি ভোল পাল্টান। অভিযোগ রয়েছে—নিজেকে তথাকথিত “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের” ব্যানারে যুক্ত করে ভুয়া পরিচয়ে আন্দোলনের নেত্রী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। এই ব্যানার ব্যবহার করে তিনি একাধিকবার বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে শিক্ষকদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন এবং ১৯জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্র হত্যার মিথ্যা মামলা করেন এতে শিক্ষার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে মিরপুর-১০ সেনা ক্যাম্পের অফিসারগণ তাকে একাধিকবার সতর্ক করেন। আরও অভিযোগ রয়েছে—আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী কিছু সচিব ও মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ও সহকর্মীদের ওপর ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তার করেন। কোনো অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নেওয়ার চেষ্টা করতেন বলে একাধিক শিক্ষক ও অভিভাবক অভিযোগ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও ডিজিটাল অপরাধের অভিযোগও রয়েছে। প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়—তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কুরুচিপূর্ণ, বিকৃত ও মানহানিকর ভিডিও ও কনটেন্ট তৈরি করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে সংশ্লিষ্টদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করছেন। এসব কর্মকাণ্ড এখনো অব্যাহত রয়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—নিজের অনৈতিক কর্মকাণ্ড আড়াল ও প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব দুর্বল করার উদ্দেশ্যে তিনি মাউশির কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমি, সহকারী প্রধান শিক্ষক জনাব আহমাদ উল্লাহ কাসেমীসহ একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মাউশি ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একের পর এক অভিযোগ দায়ের করেন। অধিকাংশ অভিযোগ তদন্তে ভিত্তিহীন প্ৰমাণিত হলেও ধারাবাহিক অপপ্রচারের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুন্ন করা হয়। পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের তদন্তে তিনি আমার বিরুদ্ধেও মিথ্যা অভিযোগ করেন—যেমন মনিপুর স্কুল থেকে আমাকে ঘুষ হিসেবে গাড়ি দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন, যার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আরও অভিযোগ রয়েছে—ব্যক্তিগত প্রভাব ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যবহার করে তিনি মাউশিকে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেন। এর ফলে প্রধান শিক্ষক জিনাত ফারহানা (আমার) সরকারি বেতন ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। এই বিষয়ে রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট উক্ত আদেশ স্থগিত ঘোষণা করেন। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে—শিক্ষক সমিতির শীর্ষ নেতা সেলিম ভূঁইয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে কোনো সদস্যপদ ছাড়াই বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পদ দাবি করে প্রচার চালান, যা শিক্ষক সমাজে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। আমলাতান্ত্রিক অপতৎপরতার অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন সচিব ও আমলার অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশগ্রহণ করে নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করতেন এবং সাবেক সিনিয়র সচিব নজরুল ইসলামের স্ত্রী পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেন। পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারে একজন আমলার স্ত্রী ও এমপি মন্ত্রীর আস্থাভাজন থেকেও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনে যোগ্যতা ও স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া ছাড়াই নিয়মিত শিল্পী হিসেবে অনুষ্ঠান করার বিষয়টি নিয়েও শিক্ষক সমাজ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বিপাশা ইয়াসমিনের কর্মকান্ড বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও সুনাম মারাত্মক ভাবে ক্ষুন্ন করেছে।
