অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালকদের গত শনিবারের সভা চলে প্রায় আট ঘণ্টা। দীর্ঘ এই বৈঠকের একপর্যায়ে হঠাৎ করেই জাতীয় দলে সাকিব আল হাসানকে আবার বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব তোলেন প্রভাবশালী এক পরিচালক। তাঁকে সমর্থন দেন আরও দুজন পরিচালক। বিষয়টি আগে থেকে আলোচ্যসূচিতে না থাকায় বৈঠকে উপস্থিত অনেকেই এতে বিস্মিত হন।
সাধারণত বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের সভায় কোন কোন বিষয় আলোচনা হবে, তা আগেই জানানো হয়। কিন্তু সেদিন সাকিব ইস্যুটি আগাম এজেন্ডায় ছিল না। তা সত্ত্বেও সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে বিসিবি পরিচালক আমজাদ হোসেন দাবি করেন, পরিচালকদের ‘সর্বসম্মতিক্রমে’ সিদ্ধান্ত হয়েছে—সাকিব আল হাসান এখন থেকে জাতীয় দলের হয়ে খেলার জন্য বিবেচিত হবেন।
টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না খেলা এবং বিসিবি পরিচালক ইশতিয়াক সাদেকের পদত্যাগ—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ভিড়ে হঠাৎ এমন ঘোষণায় ক্রিকেটাঙ্গনে চমক ছড়ায়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সাকিবের ফর্ম ও ফিটনেস ঠিক থাকলে এবং নির্বাচকেরা চাইলে তাঁকে দলে নেওয়া যাবে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়—‘যে ভেন্যুতে খেলা হবে, সেখানে উপস্থিত থাকার সক্ষমতা থাকতে হবে।’
এই শর্তেই সাকিবের জাতীয় দলে ফেরার প্রশ্নে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রায় দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের মাঠে খেলার সেই ‘সক্ষমতা’ তাঁর নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় সাকিব ছিলেন দেশের বাইরে। এরপর আর দেশে ফিরতে পারেননি নৌকা প্রতীকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই অলরাউন্ডার।
বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অন্য অনেক নেতার মতো সাকিবের নামেও হত্যা মামলা রয়েছে। পাশাপাশি শেয়ার কেলেঙ্কারি ও দুদকের মামলাসহ তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। ফলে দেশে ফিরলে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা রয়েছে। এসব কারণেই জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে কার্যত তিনি ‘প্রবাসী’ অবস্থায় আছেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের বিপক্ষে সর্বশেষ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন সাকিব। ওই বছরের অক্টোবরে দেশের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর পরিকল্পনা থাকলেও নিরাপত্তাশঙ্কায় মাঝপথ থেকেই তাঁকে ফিরে যেতে হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানসংক্রান্ত পোস্ট নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া গত বছরের সেপ্টেম্বরে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, সাকিবকে দেশে ফিরতে না দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। এমনকি সাকিবকে আর বাংলাদেশের হয়ে খেলতে না দেওয়ার নির্দেশনাও তিনি বিসিবিকে দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
পরবর্তীতে আসিফ মাহমুদের পদত্যাগের পর ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল। এখন প্রশ্ন উঠেছে—সরকারের অবস্থান কি বদলেছে? সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিসিবির পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি। শুধু জানানো হয়, সাকিবের পথে থাকা বাধাগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিসিবির একটি সূত্র জানায়, সাকিবকে ফেরানোর আলোচনা শুরু হয়েছে অন্তত ১০–১২ দিন আগে। নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্তের সময় সরকারের সঙ্গে সাকিব প্রসঙ্গেও যোগাযোগ হয়। বিসিবির ধারণা, কয়েক মাস আগের তুলনায় সরকারের অবস্থান এখন ইতিবাচক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিচালক বলেন, সরকারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়েই সাকিবকে বিবেচনায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত সামনে আনা হয়েছে।
সাকিব নিজেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, দেশের মাটিতে খেলেই তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে চান। বিসিবিও তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ করতে আগ্রহী। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সাকিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
অনেকে মনে করছেন, টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না খেলার বিষয়টি আড়াল করতেই সাকিবকে হঠাৎ সামনে আনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিদায় নেবে—এই সময়ের মধ্যে সাকিবের মামলাগুলো কীভাবে সমাধান হবে, তা নিয়েও বিসিবির কাছে পরিষ্কার কোনো উত্তর নেই।
সাকিব যদি আইনি নিশ্চয়তা না পান, তাহলে দেশে ফিরে গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়ে খেলতে রাজি হবেন কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। সে ক্ষেত্রে দলে বিবেচনার যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তার সঙ্গে আগের অবস্থার খুব একটা পার্থক্য থাকছে না।
তবে বিসিবির কয়েকজন পরিচালক এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, সরকারের বর্তমান দায়িত্বশীল মহল সাকিবকে খেলানোর বিষয়ে ইতিবাচক। তাঁর আইনি জটিলতা সমাধানের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। যদিও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
