মোসাঃ তানজিলা
রাজধানী ঢাকা শহরে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ যাতায়াতের জন্য পাবলিক বাসের ওপর নির্ভরশীল। অফিসগামী কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, গৃহিণী, ছোট শিশু—সবাই এই পরিবহন ব্যবস্থার যাত্রী। কিন্তু প্রতিদিনের এই যাত্রা অনেকের জন্য হয়ে উঠছে একপ্রকার আতঙ্কের নাম। এর বড় একটি কারণ হলো বাস চালক ও হেল্পারদের নির্বিঘ্ন ধূমপানের অভ্যাস।
প্রায়ই দেখা যায়, বাসের ভেতরে জানালা বন্ধ থাকা অবস্থায়ও ড্রাইভার গাড়ি চালাতে চালাতে সিগারেট ধরাচ্ছেন। এতে ধোঁয়ায় ভরে যায় পুরো বাস। গরমের দিনে যখন জানালা খোলা থাকে না বা যাত্রীরা গাদাগাদি করে বসে থাকে, তখন এই ধোঁয়া যাত্রীদের জন্য এক অস্বস্তিকর ও স্বাস্থ্যহানিকর পরিস্থিতি তৈরি করে। বিশেষ করে মহিলা যাত্রী, শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
বাংলাদেশের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—পাবলিক পরিবহনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই আইন লঙ্ঘন করলে ৩০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে এবং একই ব্যক্তি বারবার আইন ভঙ্গ করলে জরিমানার পরিমাণ দ্বিগুণ হবে। কিন্তু বাস্তবে এই আইন কার্যকর করতে প্রশাসনের ভূমিকা তেমন চোখে পড়ে না। ফলে বাসের ড্রাইভাররা প্রায়ই আইনকে উপেক্ষা করে ধূমপান করেন।
যাত্রীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ড্রাইভারকে ধূমপান বন্ধ করতে বললে উল্টো তিনি খারাপ ব্যবহার করেন, এমনকি যাত্রীকে নেমে যেতে বলেন। এক যাত্রী তার ভুক্তভোগী অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন—“ড্রাইভারকে ধূমপান না করতে বললে উল্টো তিনি বাজে কথা বলেন। ট্রাফিক পুলিশকে জানালেও তেমন ব্যবস্থা নিতে দেখি না। ড্রাইভাররা বলে—‘ওরাও তো খায়!’ অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও দায়ী করে বসেন।”
এমন পরিস্থিতিতে অনেক যাত্রী নীরবে সহ্য করেন, কারণ বিরোধে জড়ালে যাত্রা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক প্রতিনিধি বলেন—
“আমরা বহুবার ড্রাইভারদের ধূমপান না করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। বাসে ‘ধূমপান নিষিদ্ধ’ স্টিকারও লাগানো হয়। কিন্তু আইন কার্যকর করতে হলে ট্রাফিক পুলিশ ও যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলে ড্রাইভাররা ভয় পাবে এবং ধূমপান কমবে।”
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান—
“পাবলিক বাসে ধূমপান আইনত নিষিদ্ধ। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। তবে যাত্রীদেরও অনুরোধ করব—এমন ঘটনা দেখলে আমাদের হেল্পলাইনে জানাতে। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।” তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, ড্রাইভার ও হেল্পারদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। তাদের জন্য সচেতনতা কার্যক্রম চালানো, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া, এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে ৭,০০০ এরও বেশি ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যার মধ্যে ৭০টিরও বেশি ক্যানসার সৃষ্টিকারী। দীর্ঘসময় এই ধোঁয়ার মধ্যে থাকলে যাত্রীদের শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, হৃদরোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যারা ধূমপান করেন না, তাদের জন্য এই পরোক্ষ ধূমপান আরও বিপজ্জনক।
এখনই সময় প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আইন ভঙ্গকারীদের তাৎক্ষণিক জরিমানা করা উচিত। বাস মালিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে—তাদের ড্রাইভারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, বাসে সিসিটিভি বসানো, এবং ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। একইসাথে যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে এবং সাহস করে অভিযোগ করতে হবে। একটি সভ্য ও স্বাস্থ্যকর শহরের জন্য পাবলিক পরিবহনে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিদিন লাখো মানুষ অজান্তেই ধোঁয়ার মাধ্যমে নানা রোগে আক্রান্ত হবে।
মোসাঃ তানজিলা
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
