ঢাকা | বঙ্গাব্দ

শহর থেকে কোথায় হারালো কাকেদের দল?

মো. ছাব্বির হোসাইন
  • আপলোড তারিখঃ 16-11-2025 ইং |
  • নিউজটি দেখেছেনঃ 290149 জন
শহর থেকে কোথায় হারালো কাকেদের দল? ছবির ক্যাপশন: .

ঢাকার সকাল আগে এমন ছিল না। অ্যালার্ম ঘড়ি নয়, দিন শুরু হতো কাকের কা কা ডাকে। বৈদ্যুতিক তারের ওপর লাইন ধরে বসে থাকা কাক, গাছের ডালে দলবদ্ধ উড়াউড়ি, এসব ছিল ঢাকার ভোরবেলার স্বাভাবিক দৃশ্য। মাত্র চার-পাঁচ বছর আগেও রাজধানীর প্রায় সব এলাকায় কাক ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু আজ সেই পরিচিত ডাক যেন হারিয়ে গেছে শহরের শব্দের ভিড়ে। নাগরিকেরা এখন প্রশ্ন করেন, “কোথায় গেল সেই কাকেরা?” বাস্তবতা হলো, ঢাকার কাকের সংখ্যা গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এটি কোনো সাধারণ পরিবর্তন নয়; শহরের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত।


কী কারণে কমছে কাকের সংখ্যা?


(ক) আবাসস্থল ধ্বংস ও গাছপালা কমে যাওয়া। 

ঢাকায় দ্রুত নগরায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বড় গাছ কাটা, পার্ক সংকুচিত হওয়া এবং সবুজ এলাকা হারিয়ে যাওয়ায় কাকের প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট হয়েছে। কাকেরা দলবদ্ধভাবে বাসা বাঁধার জন্য বড় গাছ প্রয়োজন, যা এখন খুবই বিরল।


(খ) দূষিত খাদ্য ও বিষক্রিয়া। 

কাকরা শহরের ময়লা-আবর্জনা খেয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু এখন সেই ময়লার মধ্যেই রয়েছে প্লাস্টিক, রাসায়নিক, শিল্পবর্জ্য, কীটনাশক ও টক্সিনযুক্ত খাবার। এই দূষিত খাদ্য খেয়ে কাকের মধ্যে রোগ বিস্তার, পরজীবী সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে।


(গ) শব্দদূষণ ও আলো দূষণ। 

উচ্চ ভবন, যানবাহনের শব্দ, কনস্ট্রাকশনের কাজ, এলইডি আলো, এসবের ফলে কাকের প্রজননচক্র ও স্বাভাবিক আচরণে ব্যাঘাত ঘটছে। অনেক কাক দল ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছে।


(ঘ) পরিবেশগত রোগ ও ভাইরাস। 

গত এক দশকে বিভিন্ন অঞ্চলে কাকের গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যার পেছনে বার্ড-ফ্লু, নিউক্যাসল ডিজিজসহ বিভিন্ন ভাইরাসের সম্পর্ক রয়েছে। নগর এলাকায় দ্রুত ছড়ানো রোগ কাকের সংখ্যা কমাচ্ছে।


কাক বিলুপ্ত হলে শহরের কী হবে? 


(ক) আবর্জনা দ্রুত বাড়বে। 

কাক শহরের ‘প্রাকৃতিক পরিস্কারক/ঝাড়ুদার’। তারা প্রতিদিন অগণিত পচা খাবার, মৃত প্রাণীর অবশিষ্টাংশ ও নোংরা খেয়ে শহরের ময়লা কমিয়ে দেয়। কাক কমে গেলে ময়লা জমে যাবে, ইঁদুর বাড়বে, মাছি-মশার পরিমাণ বাড়বে, ছড়াবে ব্যাকটেরিয়া ও রোগজীবাণু। এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের বড় হুমকি।


(খ) ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়বে। 

কাক শুধু ময়লা খায় না; তারা পোকামাকড়, ইঁদুর, সরীসৃপ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। কাক না থাকলে শহরের খাদ্যচক্রে অসমতা তৈরি হবে, যা নতুন ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।


(গ) রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়বে। 

পচা খাবার ও মরদেহ দ্রুত পচে গ্যাস-জীবাণু ছড়ায়। সাধারণত কাক প্রথমে এগুলো পরিষ্কার করে। কাক কমে গেলে রোগবাহিত ব্যাকটেরিয়া পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকবে, যা শহরে সংক্রমণ বাড়াতে পারে।


কাক ফেরাতে করণীয় কী? 


বড় গাছ সংরক্ষণ ও নতুন গাছ লাগানো, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে পাখি-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্পবর্জ্য ও রাসায়নিক দূষণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, ময়লা ব্যবস্থাপনায় নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, শহরে প্রাণিবৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ ও জরিপ বৃদ্ধি, নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, কাক মেরে ফেলতে নয়, বাঁচাতে শিখতে হবে।


“শহরে কাকের সংখ্যা কমে যাওয়া নগর পরিবেশের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈব সূচক। খাদ্য উৎসের সংকট, বাসস্থানের অভাব, দূষণ ও মানবচাপ এ পতনের মূল কারণ। কাককে সংরক্ষণ করা মানে নগর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা। এজন্য গাছ সংরক্ষণ, নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও মানুষ-পাখি সহাবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি।”- (মো. ওমর ফারুক) 


ঢাকার প্রতিটি সকাল একসময় কাকের ডাকেই শুরু হতো। আজ সেই ডাক অনেকটাই নিঃশেষ। কাকের অনুপস্থিতি আমাদের চোখে না পড়লেও, এর প্রভাব পড়ছে শহরের বাতাস, বর্জ্য, রোগব্যাধি ও জীববৈচিত্র্যের উপর। কাক বিলুপ্ত হওয়া মানে শুধু একটি পাখির না থাকা নয়, এটি শহরের পরিবেশগত সুস্থতা হারানো। যদি এখনই পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী দিনে ঢাকা হবে আরও অস্বাস্থ্যকর, দূষিত, পোকামাকড়-পূর্ণ, মানুষের জন্য বিপজ্জনক একটি শহর। এখনই সময় ঢাকা শহরকে শুধু বিল্ডিংয়ের নয়, পাখি-গাছ-প্রকৃতির শহর হিসেবে গড়ে তোলার। কাকের কা কা ডাক ফিরলে তবেই ফিরবে শহরের স্বাভাবিক জীবন।


(লেখাটির সাথে সহমত পোষণ করেন মো. ওমর ফারুক, বিএস ও এমএস, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রভাষক, ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ।) 


লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।


নিউজটি পোস্ট করেছেনঃ Bangladesh Shomachar

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
notebook

নতুন একনেক গঠন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভাপতি