ঢাকা | বঙ্গাব্দ

থার্টি ফাস্ট নাইটে আতশবাজি ও ফানুস; ভয়াবহ ঝুঁকিতে পশু-পাখি, প্রকৃতি ও জনজীবন

মো. ছাব্বির হোসাইন
  • আপলোড তারিখঃ 28-12-2025 ইং |
  • নিউজটি দেখেছেনঃ 168769 জন
থার্টি ফাস্ট নাইটে আতশবাজি ও ফানুস; ভয়াবহ ঝুঁকিতে পশু-পাখি, প্রকৃতি ও জনজীবন ছবির ক্যাপশন: .

নতুন বছরকে বরণ করে নিতে থার্টি ফাস্ট নাইট আজ শহরজীবনে এক বহুল প্রচলিত উৎসবে রূপ নিয়েছে। আতশবাজির আলো, বিকট শব্দ আর আকাশভরা ফানুসে রাতজুড়ে চলে আনন্দ-উল্লাস। কিন্তু এই এক রাতের উন্মাদনা যে কতটা গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনে, তা অনেকেরই অজানা। এই ক্ষতির শিকার শুধু প্রকৃতি বা পশু-পাখি নয়; হার্টের রোগী, শিশু ও বয়স্ক মানুষের জীবনও পড়ে গুরুতর ঝুঁকিতে।


আতশবাজি; পশু-পাখির জন্য আতঙ্ক, মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি:

আতশবাজির বিকট শব্দ মানুষের কানে ক্ষণিকের বিরক্তি মনে হলেও পশু-পাখির জন্য তা চরম আতঙ্কের কারণ। প্রাণীদের শ্রবণক্ষমতা মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। হঠাৎ উচ্চ শব্দে তারা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে, পালিয়ে বেড়ায়, বাসা ছেড়ে দেয়, এমনকি আতঙ্কে অসুস্থ বা মারা যায়। একই সঙ্গে এই শব্দদূষণ মানুষের জন্যও কম বিপজ্জনক নয়। বিশেষ করে হার্টের রোগীদের ক্ষেত্রে আকস্মিক উচ্চ শব্দ হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, রক্তচাপ বৃদ্ধি করে এবং হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। চিকিৎসকদের মতে, আতশবাজির শব্দে অনেক হৃদরোগী হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা কিংবা আতঙ্কজনিত সমস্যায় ভোগেন। 


শিশু ও বয়স্কদের জন্য মারাত্মক প্রভাব:

শিশু ও বয়স্করা শব্দ ও বায়ুদূষণের প্রতি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। আতশবাজির শব্দে শিশুরা ভয় পেয়ে চিৎকার করে, ঘুম ভেঙে যায়, মানসিক চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ভয় শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুদের চোখ, কান, ফুসফুস ও মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে; কারণ এর তীব্র শব্দ, বিষাক্ত ধোঁয়া (ভারী ধাতু ও রাসায়নিক পদার্থযুক্ত) এবং বিস্ফোরণের কারণে শারীরিক আঘাত, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে। অন্যদিকে বয়স্কদের ক্ষেত্রে উচ্চ শব্দ ও ধোঁয়া শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, রক্তচাপ বৃদ্ধি এবং স্নায়বিক সমস্যার কারণ হতে পারে। অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস বা ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত বয়স্কদের জন্য থার্টি ফাস্ট নাইট প্রায়ই হয়ে ওঠে এক আতঙ্কের রাত।


ফানুস; সৌন্দর্যের আড়ালে অগ্নিকাণ্ড ও পরিবেশ বিপর্যয়:

ফানুস দেখতে যতটা সুন্দর, বাস্তবে ততটাই বিপজ্জনক। বাতাসের দিক পরিবর্তন হলে জ্বলন্ত ফানুস পড়ে যেতে পারে গাছ, ঘরবাড়ি, কারখানা বা পশুর খামারে। প্রতিবছরই ফানুস থেকে আগুন লেগে বসতবাড়ি, গুদাম, কৃষিজমি ও বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। ফানুসের তার, কাগজ ও প্লাস্টিক পরে গিয়ে পরিবেশ দূষণ করে। অনেক পশু-পাখি এসব আবর্জনায় জড়িয়ে আহত হয় বা মারা যায়। জলাশয়ে পড়লে তা জলজ প্রাণীর জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।


আতশবাজির ধোঁয়া, বিষাক্ত বায়ুর নীরব আক্রমণ:

আতশবাজি পোড়ানোর ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা (PM2.5)। এই দূষিত বায়ু হার্টের রোগী, শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত মানুষের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এক রাতের অতিরিক্ত দূষণও শহরের বায়ুমান কয়েকদিনের জন্য বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়ে পুরো জনস্বাস্থ্যের ওপর।


আইন আছে, সচেতনতার অভাব প্রকট:

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন ও অগ্নি নিরাপত্তা বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও থার্টি ফাস্ট নাইটে এর প্রয়োগ খুবই সীমিত। প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ব্যক্তিগত সচেতনতা।


আনন্দ হোক, কিন্তু মানবিক ও দায়িত্বশীলভাবে:

নতুন বছর উদযাপন অবশ্যই আনন্দের হবে, কিন্তু সেই আনন্দ যেন কোনো পশু-পাখির জীবন, কোনো শিশুর মানসিক স্বাস্থ‍্য, কোনো বয়স্ক বা হার্টের রোগীর প্রাণহানির কারণ না হয়। আতশবাজি ও ফানুসের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোকসজ্জা, পারিবারিক মিলনমেলা কিংবা শান্তিপূর্ণ উদযাপন হতে পারে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প।


একটি সভ্য সমাজের পরিচয় হলো, সে তার আনন্দ উদযাপন করে কারও ক্ষতি না করে। নতুন বছর আসুক মানবিকতা, সচেতনতা ও প্রকৃতির প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে। কারণ এই পৃথিবী শুধু মানুষের নয়, এখানে পশু-পাখি, প্রকৃতি এবং প্রতিটি জীবনের নিরাপত্তাই আমাদের সত্যিকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।


লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।


নিউজটি পোস্ট করেছেনঃ Bangladesh Shomachar

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
notebook

নতুন একনেক গঠন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভাপতি